এই ব্লগটি সন্ধান করুন

সোমবার, ১৮ জুলাই, ২০১১

কাদিয়ানীরা নিন্দনীয় কেন

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ্‌র অসংখ্য প্রশংসা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর অগণিত দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক, যাকে আল্লাহ তাআলা সমস্ত নবী ও রাসূলদের সর্বশেষে প্রেরণ করে এ ধারা বন্ধ করে দিয়েছেন। এবং যার দ্বীনকে কিয়ামত পর্যন্ত টিকিয়ে রাখার ওয়াদা করেছেন, যার পরে কোন নবী আসেনি এবং আসবেওনা যদিও মিথ্যুকরা এ ব্যাপারে চেষ্টা করতে কম করেনি।

আল্লাহ ইসলামকেই একমাত্রমনোনিত দ্বীন হিসাবে গ্রহণ করেছেন সুতরাং কারো থেকে অন্য কোন দ্বীনের অনুসারী হওয়া মেনে নেবেননা। আল্লাহ বলেন:

অর্থ্যাৎ: আর যে ইসলাম ছাড়া অপর কোন দ্বীন চায়, তার থেকে তা কখনো গ্রহন করা হবেনা, বরং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে গণ্য হবে। (সূরা আল ইমরান ৮৫)

ইসলামের তিনটি স্তর রয়েছে:

প্রথম স্তর: ইসলাম (বাহ্যিক দিক) এর ৫টি প্রধান অঙ্গ রয়েছে।

১. আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন সঠিক উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লার প্রেরিত পুরুষ রাসূল বলে সাক্ষ্য দেয়া

২. নামাজ প্রতিষ্ঠা করা।

৩. যাকাত প্রদান করা।

৪. রমজানের রোজা রাখা।

৫. সক্ষম ব্যক্তির জন্য আল্লাহর ঘর কাবা শরিফের হজ্জ করা।

দ্বিতীয় স্তর: ঈমান (অভ্যন্তরীন দিক) এর ৬টি প্রধান অঙ্গ রয়েছে:

১. আল্লাহর উপর ঈমান আনা।

২. ফেরেশতাদের উপর ঈমান

৩. আল্লাহর কিতাবসমূহের উপর ঈমান, কুরআনে কারীমে সকল কিতাবের কথাই এসেছে।

৪. আল্লাহর রাসূল সমূহের উপর ঈমান আনা যার ধারা শেষ হয়েছে, মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ দ্বারা যিনি আরবী; হাশেমী গোত্র থেকে ছিলেন, জন্ম ও নবী হিসেবে মনোনিত হয়েছিলেন মক্কাতে হিজরত ও মৃত্যুবরণ করেছিলেন মদীনা মুনাওয়ারায়।

৫. আখেরাতের উপর ঈমান আনা।

৬. তাকদীর বা ভাগ্যের উপর ঈমান আনা, এমনভাবে যে, ভাল-মন্দ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে।

তৃতীয় স্তর: ইহ্‌সান, যার অর্থ হলো: প্রত্যেক মুমিন মুসলিম এমনভাবে আল্লাহর উপাসনা করবে যেমন সে তাকে দেখছে, আর যদি তা সম্ভব না হয়ে উঠে, তবে এমনভাবে ইবাদতে মনোনিবেশ করা যেন আল্লাহ তাকে দেখছেন।

তবে ইসলামের (বাহ্যিক অংশের) ভিত্তি ও চুড়া হলো, এ কথার সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সঠিক কোন উপাস্য নেই, আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁরই প্রেরিত রাসূল

এ শাহাদাত বা সাক্ষ্য দেয়ার অর্থ হচ্ছে:

আল্লাহ ছাড়া কোন উপাসনার যোগ্য সঠিক উপাস্য বা মাবুদ নেই। এ সব জানা, বুঝা, বিশ্বাস করা এবং মনে প্রাণে আঁকড়ে ধরা; আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রাসূল বা প্রেরিত পুরুষ তার বান্দা, সুতরাং তার ইবাদত বা উপাসনা না করা, তিনি তাঁর রাসূল হেতু তাকে সত্য বলে বিশ্বাস করা; তিনি যে সমস্ত সংবাদ দিয়েছেন সেগুলিকে সত্য বলে জানা তিনি যা নির্দেশ দিয়েছেন সে গুলিকে অনুসরণ করা, যা নিষেধ করেছেন তা ত্যাগ করা; আর আল্লাহর ইবাদতের ব্যাপারে তার কথার উপর নির্ভর করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবর্তিত পন্থা ছাড়া অন্য কোন পন্থায় আল্লাহর ইবাদত না করা, আর সে অনুসারে আমল করা, এবং অপরের কাছে সেটা পৌঁছানো, জানানো, বিবৃত করণ এবং অপরকে নির্দেশ দেয়া, আর যতটুকু সম্ভব এ ব্যাপারে বাধ্য থাকা বা আনুগত্য করা।

তবে এই সাক্ষ্য ঐ পর্যন্ত যথার্থভাবে সম্পন্ন হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত সাক্ষ্যদাতা এর অর্থ অন্তনিহিত তথ্য সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে জ্ঞাত না হবে, সাথে সাথে তার সে জ্ঞান হতে হবে দৃঢ় বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত; যার সামনে সন্দেহ ও অজ্ঞতার কোন স্থান থাকবে না, তিরোহিত দূরিভূত করবে মিথ্যার ও অসত্যের বেড়াজাল।

অনুরূপভাবে এ সাক্ষ্য সম্পন্ন হওয়ার অন্য আরেকটি শর্ত হলো: সাক্ষ্যদাতাকে সম্পূর্ণ কায়োমনোবাক্যে খাঁটি আল্লাহর উদ্দেশ্যে অবিকৃতভাবে তা মেনে নিতে হবে, যাতে করে তার বিপরীত শিরক্‌ বা বিদ‘আত সেখানে স্থান না পায়।

শিরক হলো, ইবাদতের কোন অংশকে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের দিকে নিবদ্ধ করা, আর বিদ‘আত হলো ইবাদত বা উপাসনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত এর বিপরিতে অনুষ্ঠিত হওয়া।

সুতরাং যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দান পরিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করবে তাকে শিরক বিদ‘আত স্পর্শ করতে পারবে না।

এমনিভাবে এ সাক্ষ্য হতে হবে এমন দৃঢ় বিশ্বাস ওপূর্ণ বশ্যতার ভিত্তিতে যার সামনে এর অন্তর্নিহিত ও অবশ্যাম্ভাবী বস্তুসমূহে অস্বীকার বিদ্রোহ, ও ঘৃনার নাম তা ব্যত্ত থাকবেনা। আর তা হলো, শুধুমাত্র এক আল্লাহর ইবাদত এবং কেবলমাত্র তাঁর রাসূলেরই অনুসরণ। আর এ সাক্ষ্য হতে হবে সম্পূর্ণভাবে এ সাক্ষ্য দান ও সাক্ষ্যদানকারীদের মনে প্রাণে ভালবেসে; যাতে করে এ সাক্ষ্য যারা দেয় না অন্তরের অন্তস্থলে তাদের প্রতি অপছন্দভাব ফুটে উঠবে; যা মূলত শির্ক ও বিদ‘আতকেই অপছন্দ করা এবং শির্ককারী মুশরিক ও বিদ‘আতকারীদেরকে এমন অপছন্দ করতে হবে যেমন তাকে আগুনে নিক্ষেপ করা সে অপছন্দ করে।

এ বন্ধুত্ব এবং শত্রুতার নীতির উপর ভিত্তি করে আমার প্রিয় ভাই রফি উনলা বাছিরি “কাদিয়ানীরা নিন্দনীয় কেন?” এ প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রয়াস পেয়েছেন। যদিও মুসলিমগণ তাদেরকে আগেই অমুসলিম সংখ্যালঘু হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন। কারণ তাদের কাছ থেকে এটা স্পষ্টভাবে এসেছে যে, তারা এক মিথ্যুক নবুওয়াতের দাবীদারের অনুসারী। কিন্তু তারা ইসলাম নামের ছত্রছায়ায় সারা বিশ্বে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বের অনেক স্থানে শক্তিশালী আস্তানা গেড়ে তার মাধ্যমে ইসলামের বিকৃত চিত্র মানুষের কাছে পেশ করছে। সুতরাং এ ব্যাপারে সাবধান করার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশেষ করে মিথ্যাবাদীদেরকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল এর বাণীতে যেভাবে ধিকৃত করা হয়েছে তা প্রচার ও প্রসার করা আজকের দিনে খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

আল্লাহ বলেন:

“তার চেয়ে কে বেশী অত্যাচারী যে আল্লাহর উপর মিথ্যার সম্পর্কে দেখায় অথবা বলে আমার কাছে ওহী (বাণী) এসেছে অথচ তার কাছে কিছুই আসেনি”[1]

অনুরুপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে পর্যন্ত ত্রিশ জনের মত মিথ্যুক প্রতারক, যাদের সবাই মনে করবে তারা আল্লাহর রাসূল, তারা প্রকাশ না পাবে সে পর্যন্ত কিয়ামত হবে না।”[2] তিনি আরও বলেন: “আমি সমস্ত নবীদের ধারা সমাপ্তকারী, আর আমার মসজিদ হলো শ্রেষ্টত্বের দিক থেকে সর্বশেষ মসজিদ”। [3]

সূতরাং যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরে নবুওয়াতের দাবী করবে সে মিথ্যুকআর এই কাদিয়ানীরা যদিও তার নিজেদের মুসলিম মনে করে থাকে; বস্তুত তারা ইসলামের উপর জঘণ্য আঘাত হেনেছে। ইবাদতের ক্ষেত্রে, নবুওয়াতের মূলে করেছে কুঠারাঘাত, যে প্রধান মূলনীতির উপর ইসলামের প্রতিষ্ঠা সেটা নষ্ট করেছে; আর তা হলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন সঠিক উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল তারা এ প্রধান বিশ্বাসকে জলাঞ্জলী দিয়েছে। আল্লাহ তাদের সাথে প্রাপ্য ব্যাবহারই করুন এবং তাদের ফেৎনা ও অনুরূপ প্রত্যেক প্রতারকের ফেৎনা থেকে আমাদেরকে হিফাযত করুন।

দোআ করি যেন আল্লাহ এর লিখককে উত্তম প্রতিদান প্রদান করেন।

وصلى الله على خاتم الأنبياء ورسله وعلى آله وأصحابه أجمعين.

সালেহ বিন আবদুল্লাহ আল আবুদ[4]

১০/০৯/১৪১৩ হি:


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

الحمد لله وحده، وصلوات الله وسلامه على من لا نبي بعده، وبعد!

কাদিয়ানীদের বাহ্যিক চাকচিক্যময় কথা-বার্তায় অনেকেই প্রতারিত হয় এবং প্রশ্ন রাখে কাদিয়ানীদেরকে খারাপ বল কেন? তারা তো নিজেদেরকে মুসলিমই বলে থাকে।

এ উদ্ভূত প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আমাদের নিম্নের কয়েকটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

. তাদের ইতিহাস

. তাদের আকিদা বিশ্বাস

. তাদের দৈনন্দিন সম্পাদিত কার্যাদি, অর্থাৎ আরকানে ইসলাম সম্পর্কে তাদের মতামত।



[1] সূরা আল-আনআম, ৯৩

[2] .বুখারী ৩/২৪৩, মুসলিম ৪/২২৪০ নং

[3] . মুসলিম শরীফ; ২/১০১২

[4] প্রাক্তন ভাইস চ্যান্সেলর, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদীনা শরীফ।

কাদিয়ানীরা নিন্দনীয় কেন?

অনুবাদকের ভূমিকা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন যে, কিয়ামত এর পূর্বে ৩০ এর মত মিথ্যুক লোক নবুওয়াতের দাবী করবে, তাঁর সে ভবিষ্যদ্বাণীর প্রমাণ আমরা দেখতে পাই গোলাম আহম্মেদ কাদিয়ানীর নবুওয়াতের দাবীর মাঝ দিয়ে। আমাদের দেশের আলেমগণ অনেক আগ থেকেই বিভিন্ন ভাবে তার দাবীর অবৈধতা প্রমাণ করেছিলেন, এবং এক সময় আলেমরা সবাই তার বিরুদ্ধে এজমা, বা ঐক্যমত পোষণ করে অমুসলিম ভন্ড নবুওয়াতের দাবীদার বলে তার ফেৎনা কে সাময়িক ভাবে রুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অনেকে তার সাথে বিতর্কে গিয়েছিলেন এবং তাকে বিতর্কেও হারিয়েছিলেন, মনে পড়ে কাজী দানভিল্লা অমৃতসরী সাহেবের সাথে তার তর্কের কথা, ভন্ড তার নবুওয়াতের সমর্থনে দলীল হিসাবে কুরআনে করিমের সূরায় ছফ-এর() শদ্ব দ্বারা দলীল নিলে কাজী সাহেব বললেন তোমার নাম তো গোলাম আহমদ এখানে বলা হয়েছে আহমদ, অর্থাৎ তুমি আহমদের গোলাম, আহমদ নও, তখন সে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ভাবে আরবী ব্যাকরণের নিয়ম অনুসারে নামের প্রথম অংশ যেখানে উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ তা ত্যাগ করে বলে উঠল, আমার নামের শেষাংশই নয়,

কাজী সাহেব দেখলেন তার সাথে তর্কে যাওয়া বৃথা, কারণ সে গোড়ামী করে কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা করার পরও প্রমাণ হাজির করতে না পেয়ে আরবী ভাষার ব্যাকরণের বিপরীতে গিয়ে তার নামের দ্বিতীয়াংশ আহমদ কেই প্রকৃত নাম বলে সাব্যস্ত করতে যাচ্ছে, তখন তিনি সম্পূর্ণ তর্কের খাতিরে বললেন, যদি নামের শেষাংশই উদ্দেশ্য হয় তবে আমার নাম সানাউল্লাহ, আমার নামের শেষাংশ আল্লাহ, তা হলে আমি তোমার আল্লাহ হয়ে তোমার মত খবিসকে কক্ষনো মানুষের জন্য নবী হিসাবে পাঠাই নি।”

অনুরূপভাবে এক সময় কাদিয়ানী নিজকে মারিয়াম (আ) বলে দাবী করলে তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, মহিলাদের ঋতুস্রাব হয়ে থাকে, তোমার কি তাও হয়?

সে নির্লজ্জের মত বলে উঠল হ্যাঁ অমুক রাত থেকে অমুক রাত পর্যন্ত আমার ঋতুস্রাব ছিল। যেহেতু তার জীবনের সব সময়ই সে বিভিন্ন নতুন নতুন দাবী নিয়ে বের হত, কখনো, ঈসা, আবার কখনো মাহদী, আবার কখনো নবী, আবার কখনো ধর্ম সংস্কারক, আবার কখনো বা সকল ধর্মের বিচারক ইত্যাদি দাবীর থুবড়িতে মুখরিত ছিল, আলেমগণ তাকে মাতাল জ্ঞানে ত্যাগ করাই সমীচিন ছিল, বরং তাকে শরীয়তের কাঠগড়ায় আসামী করে শরীয়তের হুকুম অনুসারে তার ফয়সালা করা জরুরী ছিল কিন্তু তখন ছিল উপনিবেশবাদী ব্রিটিশ সরকারের রাজত্ব, মূলত তারাই তাকে এগুলো বলতে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং তারা তাকে সব রকম সহযোগিতা ও সহানুভূতি দ্বারা সর্বদা রক্ষা করেছে সেহেতু আলেমগণ তার বিরুদ্ধে মোনাজেরা বা বিতর্কে যাওয়া ছাড়া অন্য কোন পথ পাননি, সে অবশ্য ব্রিটিশ সরকারেরজন্য বিরাট পুরুস্কার ছিল কারণ, সে যখন দাবী করল যে, সে ঈসা (আ) তখন মুসলিমদের হাদীস মতে ঈসা (আ) এর আবির্ভাবের পর আর জিযিয়া কর গ্রহণ করা হবে না এবং জ্বিহাদ এর হুকুমে পরিবর্তন হবে বলা হয়ে থাকে এজন্য সে ইংরেজদের জন্য অতি মূল্যবান পুরস্কার স্বরূপ তাদের বিরুদ্ধে জ্বিহাদ বা আযাদী আন্দোলন কে হারাম ঘোষনা দিয়ে দিল, আর তখনি দিবালোকের মত স্পষ্ট হলো যে, কার হাতের ক্রিড়নক হিসাবে সে এসব কাজ করছিল

কিন্তু আলেমগণ এতেই নিরস্ত থাকেন নি, বরং তারা তাকে মুবাহালার জন্য ডেকেছিল, সেই মুবাহালা বা পরস্পর আল্লাহর গজবকে আহবান করে মিথ্যাবাদীর উপর তার পতন কামনা করাই তার জন্য কাল হয়েছিল, কারণ কাজী ছানাউল্লা সাহেবের সাথে মুবাহালায় সে বলেছিল, আমাদের মধ্যে যে মিথ্যুক আল্লাহ যেন তাকে অপরের জীবদ্দশায় নিকৃষ্ট অবস্থায় মৃত্যু দেনতিনি বলেছিলেন আমীন, আল্লাহ কবুল করুনঅত:পর কাজী সাহেবের মৃত্যুর পূর্বেই গোলাম আহমদ কাদিয়ানী একদা পায়খানায় প্রবেশ করে সেখানেই পড়ে মারা যায়। আর এভাবে আল্লাহ মিথ্যাবাদীদের শাস্তি দিয়ে থাকেন। তার মৃত্যুর পর কাদিয়ানী আন্দোলন কিছুদিন স্তিমিত থাকলেও পরবর্তীতে তাদের কাজের ধারা দ্বিগুন চতুর্গুণ হারে পৃথিবীর চতুর্দিকে প্রসার লাভ করতে থাকে, বর্তমানেও তারা ইসলামের নাম ব্যবহার করেই তাদের মতবাদ প্রচার ও প্রসার করে থাকে। সাম্রাজ্যবাদীদের সার্বিক সহায়তায় তারা আমেরিকা ও দক্ষিন আফ্রিকায় তাদের ব্যাপক তৎপরতা দেখাচ্ছে, ইসলামী বিশ্বের আলেমদের উচিত তাদের বিরুদ্ধে কলম যুদ্ধ শুরু করা। যাতে করে উম্মতকে তাদের ফিতনা থেকে বাঁচানো সম্ভব হয়। আর সে যুদ্ধে এটি আমার এক ক্ষুদ্র প্রয়াসআল্লাহ তা‘আলার কাছে দো‘আ করছি তিনি আমার এ প্রচেষ্টাকে কবুল ও মঞ্জুর করুন। আমীন, ছুম্মা আমীন।

যাকারীয়া

মদীনা শরীফ, ১৪১৩ হি.

রবিবার, ১৭ জুলাই, ২০১১

বাংলা দেখতে সমস্যা হলে এখান হতে ফন্ট ডাউনলোড করুন। If u do not see the Bengali

If u do not see the Bengali font plz click here.

আপনি যদি বাংলা না দেখতে পান তবে এখানে ক্নিক করুন (
for main site.)

Or, visit- http://ekushey.org/?page/solaimanlipi, and click download

or, Click here and click download
or, visit-
http://www.mediafire.com/?jaanjw22idv
and click download

চাঁদ দেখা ও সন্দেহের দিন রোজা রাখা প্রসঙ্গে শরীয়তের বিধান

রোজা ইসলামি শরিয়তের শুধু গুরুত্বপূর্ণ বিধানই নয় বরং ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সারা বছরে শুধু রমজান মাসেই রোজা রাখা ফরজ।

তবে রোজা ফরজ হওয়ার সর্ম্পক কেবল চান্দ্র মাসের সাথে। আর ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুসারে মাসের হিসাবও হয় চাঁদের হিসাব অনুসারে। তাই রোজার শুরু এবং শেষ চাঁদ দেখা এবং না দেখার সাথেই সম্পৃক্ত। চাঁদ দেখা গেলে রোজা রাখতে হবে এবং চাঁদ দেখা গেলে রোজা ছাড়তে হবে ।

এটা দ্বীন ইসলামের বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য। এ ধরনের বৈশিষ্ট্য ইসলামের সার্বজনীনতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে, এবং তা সমগ্র দুনিয়ার সকল মানুষের জন্য এবং সর্ব কালের জন্য প্রজোয্য বলে নির্দেশ করে।

কারণ, বর্তমান দুনিয়ার মানুষ সাধারণত বস্তুর্নিভর। তাই তারা প্রত্যক্ষ কোন মাধ্যম বা চাক্ষুষ কোন প্রমাণকে যত তাড়াতাড়ি বা সহজে মেনে নেয় অন্য কিছুকে ততটা মেনে নেয় না ।

ফলে আল্লাহ চাঁদ দেখার সাথে ইসলামের অনেক ইবাদতকেই সম্পৃক্ত করেছেন।

عن ابن عمر رضي الله عنهما- قال: تراءى الناس الهلال؛ فأخبرت رسول الله صلي الله عليه و سلم أني رأيـته، فصـامه وأمـر النـاس بصـيامه رواه أبوداود(2342)

ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত : তিনি বলেন, মানুষ সম্মিলিতভাবে চাঁদ দেখতে লাগল, তাদের মাঝে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এসে সংবাদ প্রদান করি যে, আমি চাঁদ দেখেছি। এ সংবাদের উপর ভিত্তি করে রাসূল নিজে রোজা রাখেন, এবং সকলকে রোজা রাখার নির্দেশ দেন। আবু দাউদ : ২৩৪।

ইবনে আব্বাস হতেও এ জাতীয় একটি হাদিসের বর্ণনা পাওয়া যায়, তিনি বলেন :

جاء أعرابي إلى النبي صلي الله عليه وسلم فقال: إني رأيت الهلال -يعني رمضان- فقال: أتشهد أن لا إله إلا الله؟. قال: نعم، قال: أتشهد أن محمداً رسول الله؟، قال: نعم. قال: يا بلال أذِّن في الناس فليصوموا غدا. رواه أبوداود:2340

এক গ্রাম্য সজ্জন রাসূল সা.-এর দরবারে এসে আরজ করল : আমি রমজানের চাঁদ দেখেছি। রাসূল বললেন : তুমি কি সাক্ষ্য প্রদান কর যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই ? লোকটি উত্তর দিল : হ্যা। রাসূল বললেন : তুমি কি সাক্ষ্য প্রদান কর যে, মোহাম্মদ আল্লাহর রাসূল? লোকটি উত্তর দিল: হ্যা। রাসূল অত:পর বেলাল রা.-এর প্রতি লক্ষ্য করে বললেন : হে বেলাল ! মানুষকে জানিয়ে দাও, তারা যেন আগামীকাল রোজা রাখে। আবুদাউদ :২৩৪০

হাদিসটি ইসলাম ধর্মের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরছে ; একজন সমাজকর্মী বা মানব সেবী তার প্রতিটি পদক্ষেপে এর প্রয়োজন উপলব্ধি করে এবং বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য হয়। বিশেষত: যারা সাধারণ মানুষের মাঝে দাওয়াতের কাজ করেন এমন দায়ী ও সংস্কারকদের জন্য বিষয়টি অধিক প্রণিধানযোগ্য।

অর্থাৎ একজন সাধারণ মানুষ তার সততায় যদি কোন প্রকার প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, বুদ্ধি বা জ্ঞানগত কোন দুর্বলতার ইঙ্গিত যদি না থাকে এবং ব্যক্তিস্বার্থ যদি তার মধ্যে না থাকে তখন তার কথায় বিশ্বাস করা এবং তার কথাকে মূল্যায়ন করা ও তার সংবাদ অনুসারে কোন সংবাদ দেয়া অসঙ্গত নয়। কারণ, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বীনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে-যাকে রুকনের মর্যাদায় ভূষিত করা হয়েছে-সাধারণ এক গ্রাম্য ব্যক্তির কথা গ্রহণ করেছেন।

হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় রমজান মাসের চাঁদ এক ব্যক্তির দেখাই যথেষ্ট। যদি কোন ব্যক্তি চাঁদ দেখার পর যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট এসে সংবাদ দেয় এবং কর্তৃপক্ষ তার সংবাদ যাচাই করার পর যদি তার সংবাদ গ্রহণযোগ্য মনে করে তখন তার সংবাদ দ্বারা রমজানের চাঁদ প্রমাণিত হবে এবং কর্তৃপক্ষ যখন ঘোষণা দেবে তখন জন সাধারণের জন্য রোজা রাখা ওয়াজিব হবে।

কোন কারণে শাবান মাসের ২৯ তারিখে চাঁদ দেখা না গেলে বা আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় কোথাও হতে নির্ভরযোগ্য কোন সংবাদ পাওয়া না গেলে তখন অবশ্যই ত্রিশ দিন পূরণ করতে হবে এবং ত্রিশ দিন পুরো করার পর রোজা রাখবে।

এ ক্ষেত্রে পঞ্জিকা অনুসারে বিধা প্রদান ইসলামি শরিয়ত গ্রহণ করে না। কারণ, ইসলাম মাসের শুরু এবং শেষ নির্ধারণ করেছে চাঁদ দেখা এবং না-দেখার উপর ভিত্তি করে, ক্যালেন্ডারের হিসাবের উপর ভিত্তি করে নয়। সুতরাং যদি কোন দিক হতে চাঁদ দেখার সংবাদ না আসে তখন ত্রিশ দিন পূরণ করবে। রাসূল সা. বলেন -

صوموا لرؤيته وأفطروا لرؤيته، وانسكوا لها؛ فإن غم عليكم فأكملوا ثلاثين، فإن شهد شاهدان فصوموا وأفطروا . النسائي:2116

তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখ, চাঁদ দেখেই ভঙ্গ কর। চাঁদ দেখাকে অভ্যাসে পরিণত কর। যদি চাঁদ দেখা না যায়, তবে ত্রিশ দিন পূরণ কর। যদি দুই ব্যক্তি সাক্ষ্য প্রদান করে, তবে তোমরা রোজা রাখ, এবং রোজা ভঙ্গ কর। নাসায়ি : ২১১৬।

الشهر تسع وعشرون ليلة، فلا تصوموا حتى تروه، فإن غم عليكم فأكملوا العدة ثلاثين. البخاري: 1808

মাস হল ২৯ রাত্রি। তবে, চাঁদ না দেখে তোমরা রোজা রেখ না। যদি চাঁদ না দেখা যায়, তবে ত্রিশ দিন পূর্ণ কর। বুখারী হাদিস নং ১৮০৮

উল্লেখিত হাদিসগুলো দ্বারা প্রমাণিত হয় কোন কারণে চাঁদ দেখা না গেলে অবশ্যই তাকে ত্রিশদিন পূর্ণ করতে হবে। শরিয়ত বিষয়টিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পর এ সংক্রান্ত অতি সাবধানতার পদ্ধতি অবলম্বন নিষ্প্রয়োজন। সুতরাং রাসূল সা. এ বিষয়ে পরিপূর্ণ সমাধান দেয়ার পরও যেন কেউ সন্দেহের দিন রোজা রাখাকে বুর্জুগী মনে না করে বরং রোজা রাখা হতে বিরত থাকে। কারণ এর মধ্যে কোন প্রকার তাকওয়া বা পরহেজগারী নিহিত নেই বরং তাকওয়া হল রাসূল সা.-এর সুন্নাতের অনুকরণ এবং তার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন ।

সন্দেহের দিন রোজা রাখার বিধান

উনত্রিশ তারিখে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হওয়ার কারণে যদি আকাশে চাঁদ দেখা না যায় এবং কোথাও থেকে চাঁদ দেখার কোন সংবাদ না আসে, তখন শাবানের ত্রিশ তারিখকে হাদিসের ভাষায় সন্দেহের দিন বলা হয় । এ দিন রোজা রাখা সম্পর্কে হাদিসে সম্পূর্ণ নিষেধ করা হয়েছে ।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্দেহের দিনে রোজা পালন করে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বনের ব্যাপারে নিষেধ করে এরশাদ করেছেন -

لا تصوموا قبل رمضان؛ صوموا للرؤية وأفطروا للرؤية، فإن حالت دونه غياية فأكملوا ثلاثين. النسائي: 2130

তোমরা রমজান আগমনের পূর্বে রোজা পালন কর না, চাঁদ দেখে রোজা রাখ,এবং চাঁদ দেখে রোজা ভঙ্গ কর। যদি আআশ মেঘে ঢেকে যায়, তবে ত্রিশ দিন পূর্ণ কর। নাসায়ি : ২১৩০, হাদিসটি সহিহ। অপর স্থানে এসেছে -

لا تقدموا رمضان بصوم يوم ولا يومين، إلا رجل كان يصوم صوماً فليصمه. مسلم: 1082

তোমরা একদিন, কিংবা দুইদিন পূর্বে রোজা রেখে রমজান মাসকে এগিয়ে নেবে না, তবে এমন ব্যক্তির জন্য বৈধ, যে ব্যক্তি ঐ দিনগুলোতে নফল রোজা রাখায় অভ্যস্ত তখন তার জন্য ঐ দিন নফল রোজা রাখা বৈধ। অনেকে অতিরিক্ত সতর্কতা বশত এ দিন রোজা রাখে, যা আদৌ সঠিক নয়। কারণ রোজা শুরু এবং শেষ করাকে নির্ধারণ করেছে চাঁদ দেখা এবং না দেখার উপর। চাঁদ দেখা না গেলে রোজা রাখার কোন প্রয়োজন নাই। আম্মার ইবনে ইয়াসার রা. তাই, বলতেন :

من صام اليوم الذي يشك به الناس فقد عصى أبا القاسم صلى الله عليه وسلم.الترمذي 686

মানুষের কাছে সংশয়পূর্ণ দিবসে যে ব্যক্তি রোজা পালন করবে, সে নিশ্চয় আবুল কাছেম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবাধ্যতায় লিপ্ত হল। তিরমিজি : ৬৮৬।

কোন ব্যক্তি চাঁদ দেখার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেনি এবং তার নিকট কোন নির্ভরযোগ্য খবরও পৌঁছেনি এ অবস্থায় সে দোদুল্যমান নিয়ত নিয়ে রোজা রাখে-যেমন সে বলল, যদি দিনটি রমজান ভুক্ত হিসেবে প্রমাণ হয়, তবে আমি রমজানেরই রোজা হিসেবে তা পালন করলাম অন্যথায় তা নফল রোজা। এ ধরনের নিয়ত করা সঠিক নয়, এ রকম করলে তার রোজা হবে না। আর যদি নিয়ত করে-যদি রমজান হয় তবে তা রমজানের রোজা। অন্যথায় কোন রোজাই নয়-তখন অগ্রগণ্য মতানুসারে তার রোজা সঠিক হবে।

কারণ, নিয়ত সাধারণত তার জ্ঞানেরই অনুকরন করে। ফলে সে যখন বিশ্বাস করবে আগামি কাল রমজান মাসের শুরু তখন সে রোজার জন্য নিয়ত নির্দিষ্ট করে নিবে। কিন্ত যখন জানতে পারবে যে রমজান নয় তখন সে রোজা ভঙ্গ করে ফেলবে। আর যদি কেউ সে দিন নফল রোজা রাখার নিয়ত করে এবং এদিন নফল রোজা রাখার কোন ধারাবাহিকতা বা অভ্যাস নাই তাহলে তার রোজা হবে না। কারণ, পরস্পর বিরোধী দুটো নিয়্যত একই কাজে কার্যকর হতে পারে না।

ইসলামি শরিয়ত রোজা রাখা এবং ইফতার করার ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে সে সিদ্ধান্তকে যদি অনুকরণ করা হয় তবে বর্তমানে আমাদের দেশে পঞ্জিকা অনুসারে সৌর বাৎসরিক হিসাব গণনাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত নতুন ফিরকা ও তার ফিতনার ভয়াবহতার মুখোমুখি হতে হবে না।

শরিয়ত, সন্দেহাতীতভাবে, তার ভিত হল : রাসূল সা.হতে প্রমাণিত শরয়ি বর্ণনার প্রশ্নাতীত অনুকরণ, অনুসরণ, ও তা নির্বিঘ্নে মান্য করা। আর এ ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই শরয়ি নস বিষয়টিকে সংশ্লিষ্ট করেছে চাঁদ দেখার সাথে, পঞ্জিকার সাথে নয়।

অর্থাৎ যখন চাঁদ দেখা যাবে, যদিও তা দৃষ্ট হয় নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ-কেন্দ্র হতে, বা অন্য কোন উপায়ে তবে, সে অনুসারে আমল করা আবশ্যক হিসেবে গণ্য হবে। কারণ, বিষয়টি তখন রাসূলের উক্তির ব্যাপকতা -তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখ, কিংবা ভঙ্গ কর-এর আওতাভুক্ত হবে। আর যদি না দেখা যায়, তবে অবশ্যই ত্রিশ দিন পূর্ণ করা ওয়াজিব হবে।

বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে অনেক কিছুই এখন সহজ হয়ে গেছে। এখন যদি কেউ দূরবীনের সাহায্যে চাঁদ অনুসন্ধান করে তবে তা অবশ্যই নিষেধ নয়। তবে এমন নয় যে দুরবীন ছাড়া চলবে না এবং দুরবীন ব্যবহার করা জরুরি। কারণ, হাদিসের বাহ্যিক বর্ণনা দ্বারা আমরা অবগত হই যে, স্বাভাবিক দৃষ্টির উপর নির্ভর করাই যথেষ্ট। সম্মিলিতভাবে, চাঁদ দেখা আবশ্যক। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত। ইবনে উসাইমিন : মাজমূঊ ফাতাওয়া : খণ্ড : ১৯, পৃষ্ঠা : ৩৬-৩৭

ঈদ ও রমজান জামাতের সাথে পালন করা জরুরি

এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে ইসলাম কখনো ফিরকাবন্দি দলাদলি এবং মতবিরোধকে সমর্থন করে না। ইসলাম ঐক্য ভ্রাতৃত্ব এবং শান্তি শৃঙ্খলাকেই সমর্থন করে এবং এ বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে। বিশেষ করে ঈদ, রোজা, কোরবানি, হজ, ইত্যাদির ক্ষেত্রে ইসলাম অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করেছে।

বলতে গেলে এ সকল বিধানের মূল লক্ষ্যই হল মুসলমানদের ঐক্যকে অটুট রাখা এবং তাদের পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় করা ও অনৈক্য দুর করা। সুতরাং কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এ সকল বিষয়ে একক কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারবে না এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত এক মাত্র সরকার বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ। অন্য কেউ তাদেরকে শুধু মাত্র সহযোগিতা করতে পারে। এ বিষয়ে রাসূল সা.বলেন,

الصوم يوم تصومون، والفطر يوم تفطرون، والأضحى يوم تضحون. الترمذي: 697

অর্থ : যেদিন সকলে রোজা পালন করবে, সেদিনই রোজা পালন করতে হবে ; যেদিন সকলের ঈদুল ফিতর পালন করবে, সেদিন ঈদুল ফিতর পালন করতে হবে । আর যেদিন সকলে কোরবানি পালন করবে, সেদিনই কোরবানি বা ঈদুল আযহা উদযাপন করবে। (তিরমিজি : ৬৯৭- হাদিসটি সহিহ।)

হাদিসটির ব্যাখ্যা এই যে, রোজা রাখা, ভঙ্গ করা, ঈদ উদযাপনের ক্ষেত্রে সকলের অনুবর্তী হওয়া এবং অধিকাংশ মানুষের অনুকরণ করাই কাম্য। এ সকল বিষয়-প্রাধান্যপ্রাপ্ত মতানুসারে-ব্যক্তি বিশেষের প্রভাব বা দ্বারা নির্ধারিত হবে না।

সুতরাং কেউ একা চাঁদ দেখার পর তা যদি যথাযথ কর্তৃপক্ষ গ্রহণ না করে তখন তার উচিত হল সে বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামাবে না বরং চুপচাপ থাকবে। সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিবে এবং অধিকাংশ মানুষ বা জামাতের অনুকরণ করবে। জামাত-চ্যুত হওয়াও, এ ক্ষেত্রে, বৈধ নয়। ব্যক্তি বিশেষ ভিন্ন মতের অধিকারী হলেও, সকলের অনুবর্তী হওয়াই তার জন্য ওয়াজিব।

কোন ব্যক্তি একাকী রোজা বা ঈদের চাঁদ দেখল, এবং মানুষ তার কথা গ্রহণ করল না-তার ক্ষেত্রে কীভাবে সমাধান প্রদান করা হবে, এ ব্যাপারে আলেমগণ তিন মতে বিভক্ত হয়েছেন। একদলের মত এই যে, সে রোজা রাখবে, এবং যেহেতু সে নিজে চাঁদ প্রত্যক্ষ করেছে, তাই গোপনে রোজা ভঙ্গ করবে এবং ঈদের চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে গোপনে আহার করবে। অপরদলের মত : রোজা পালন করবে এবং সকলের সাথে সম্মিলিতভাবে পরদিন ঈদ পালন করবে। তৃতীয় মত হল : সে রোজা রাখবে সম্মিলিতভাবে সকলের সাথে, এবং ঈদও পালন করবে সকলের সাথে। তৃতীয় মতটি উপরোক্ত হাদিসের আলোকে উত্তম ও গ্রহণযোগ্য মত। ইবনে তাইমিয়ার মাজমুঊ ফাতাওয়া দৃষ্টব্য। খণ্ড : ২৫, পৃষ্ঠা : ২১৪-২১৮।

ইসলামের দিক নির্দেশনাকে যদি অনুকরণ করা হয় তাহলে কোন প্রকার ফেৎনা-ফাসাদ সৃষ্টি হয় না

বিশেষভাবে আলেম-ওলামা ইসলামের দায়ী এবং মসজিদের ইমাম ও খতিবগণ যদি চাঁদ দেখার ইসলামি বিধানকে অনুসরণ করেন তাহলে দেশে কোন প্রকার বিশৃঙ্খলা ও মত বিরোধ দেখা দেবে না। পারস্পরিক দন্দ্ব, রেষারেষি দুর হবে সমগ্র পৃথিবীর সংখ্যালঘু এবং সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদের পারস্পরিক দূরত্ব ও বিরোধ নিরসন করতে সহায়ক হবে।

এ বিষয়েটি সমাধান করার জন্য যে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে তাহল : চাঁদ দেখা এবং এর ঘোষণা দেয়ার বিষয়ে একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্বে দেয়া যেতে পারে। তারা যখন ইসলামি বিধান অনুযায়ী চাঁদ দেখা সম্পর্কে নিশ্চিত হবে তখন সমগ্র জাতিকে তা অবহিত করবে এবং তাদের দিক নির্দেশনা অনুসারে রোজা বা ঈদ পালিত হবে। আর যখন তারা ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী চাঁদ দেখা নিশ্চিত হবে না তখন ত্রিশ দিন পূর্ণ করবে।

বিভিন্ন মতের মাঝে অধিক গ্রহণযোগ্য বক্তব্য অনুসারে এ সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয় যে ভৌগলিক পার্থক্যের কারণে চাঁদ কখনো এক স্থানে দেখা দেয়, অপর স্থানে দেখা দেয় না। যদিও অন্যান্য ভূমির সাথে পার্থক্য হয়, তবুই নির্দিষ্ট ভূমির অধিবাসীরা তাদের দেখার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। কোন ভূমিতে এক ব্যক্তি যদি চাঁদ দেখে, তবে সকলের উপর রোজা রাখা বা ঈদ পালন ওয়াজিব হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে কোরআনের বর্ণনা উল্লেখ করা যেতে পারে। কোরআনে এসেছে -

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآَنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ}[البقرة: 185]

অর্থাৎ, রমজান মাস, যাতে কোরান নাজিল হয়েছে মানুষের জন্য হেদায়েত ও সত-অসত্যের পার্থক্যকারীরূপে। তোমাদের মাঝে যে মাস প্রত্যক্ষ করবে, সে যেন রোজা রাখে।

রাসূল বলেছেন্ততোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখ, এবং ভঙ্গ কর। শরিয়ত প্রণেতার পক্ষ হতে মাসে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টি চাঁদ দেখার সাথে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে। তবে, চাঁদ উদিত হওয়ার স্থান ভূমিগত পার্থক্যের ফলে পৃথক হওয়াই স্বাভাবিক। দ্র : মাজমুঊ ফাতাওয়া ইবনে উসাইমিন : খণ্ড : ১৯, পৃষ্ঠা : ৪৪-৪৭।

আর যদি কোন কারণে নিজেদের দেশে চাঁদ দেখা নিশ্চিত হতে না পারে তবে তাদের পার্শ্ববর্তী কোন ইসলামি দেশে চাঁদ দেখা গেলে তাদের অনুকরণে আমল করা শরিয়ত সম্মত। ফলে তারা যেদিন রোজা রাখবে সেদিন রোজা আর তারা যে দিন ঈদ করবে সেদিন ঈদ রাখা বাঞ্ছনীয়। কারণ যখন কোথাও হতে চাঁদ দেখা না যায় তখন এ ছাড়া আর কোন করণীয় থাকে না । কিন্তু এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন হল, এ ধরনের সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান যদি কখনো দুর্বল প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেয়-যেমন সৌরবাৎসরিক পঞ্জিকা মতে রোজা রাখা বা ভঙ্গ করার আদেশ জারি করল, তখন আমাদের কি করণীয় ?

তবে এ ক্ষেত্রে বাহ্যত: তাদের অনুসরণ করাই শ্রেয় ও অগ্রগণ্য। যারা দায়িত্বশীল বা কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। কারণ, প্রকাশ্য মতবিরোধ এড়িয়ে যাওয়া খুবই জরুরি। হাদিসে এসেছে - الصوم يوم تصومون –অর্থাৎ যেদিন সকলে রোজা পালন করবে, সেদিনই রোজা। এ হাদিসের উপর ভিত্তি করে উক্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করা যেতে পারে। তাছাড়া, শরিয়ত ও মানবিক যুক্তির ভিত্তিতে বলা যায়, ইসলামের এ জাতীয় অমৌলিক মাসআলার ব্যাপারে বিরোধ এড়িয়ে ঐক্যের ভিত দৃঢ় করা কল্যাণকর ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ।

মাসের শুরু ও সমাপ্তির ব্যাপারে সংখ্যালঘু কিছু মুসলিম সমাজের মাঝে এ জাতীয় বিরোধ থাকা কোনভাবেই উচিত নয় । কারণ এতে কলহ-বিবাদ-দলাদলি এবং বিচ্ছিন্নতা দেখা দেয় এবং অমুসলিমদের মাঝে মুসলমানদের প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং তাদের মতামত অর্থহীন হয়।

বিরুদ্ধবাদীদের সাথে কীরূপ আচরণ করা উচিত ?

এতদসত্ত্বেও বিচ্ছিন্ন কোন জামাত বা গোষ্ঠী তাদের হঠকারিতা পরিহার না করে এবং তারা তাদের মতামত অনুসারে বিচ্ছিন্নভাবে রোজা বা ঈদ পালন করে থাকেন তবে তাদের ব্যাপারে করণীয় দুটি :—

এক:-সবাই এ বিষয়ে অবগত হতে হবে যে চাঁদের মাসআলাটি ইজতেহাদি মাসআলা, যার মধ্যে মতামত প্রকাশের অবকাশ রয়েছে। কোন অবস্থাতেই মাসআলাটির মতপার্থক্য বা মতবিরোধের সুযোগকে কেন্দ্র করে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও শত্রুতা সৃষ্টি এবং সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বিনষ্টের কারণ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। শরিয়তের অনুসরণ ও অনুবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে উম্মতের ঐক্য ; সুতরাং সুন্নত আঁকড়ে ধরার নিমিত্তে পারস্পরিক বিভেদ বা অনৈক্য সৃষ্টি হোক তা কীভাবে হতে পারে !

দ্বিতীয়ত: -সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যারা সংখ্যালঘু, তারা তাদের নিজেদের মতামতকে গোপন করবে, এড়িয়ে যাবে সকলকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যারা সংখ্যাগুরু, আক্ষরিক অর্থে যাদের হাতে নেতৃত্ব, অনর্থক নিজেদের সিদ্ধান্ত পেশ করে তাদের সাথে বিরোধে লিপ্ত হবে না এবং দেশে কোন প্রকার হৈ-চৈ করবে না এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে না, তারা তাদের নিজেদের দলভারি করার চেষ্টা করবে না।

দু:খজনক হল, আমরা প্রায়শ: লক্ষ্য করি, অধিকাংশ বিরোধ বা মতবিরোধ, সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও জ্ঞানের গভীরতার অভাবেই হয়ে থাকে। প্রতিক্রিয়াশীলতা, যারা নির্দিষ্ট একটি এলাকার পক্ষ-বলয়ের হওয়ার ফলে সে এলাকার অনুবর্তী হয়, তৎপর হয় নিজেদের মতকে সকলের তুলনায় শ্রেয়তর হিসেবে প্রমাণ ও বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে এবং জড়িয়ে পড়ে ভ্রাতৃঘাতী বিরোধে। এভাবে, অনৈতিক উপায়ে তারা নিজেদের মতকে কোন প্রকার প্রামাণ্য ভিত্তির পরোয়া না করে পরিয়ে দেয় শরিয়তের টুপি, উঁচিয়ে ধরে সকলের মাথার উপর ! আল্লাহর কাছে আমাদের সকাতর প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের দ্বীনের মর্ম উপলব্ধির তওফিক দান করেন, তওফিক দান করেন মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিপূর্ণ অনুসরণের। মুসলমানদের ঐক্য-সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যের জন্য নিরলস কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করেন।

আল্লাহর কাছে যা গচ্ছিত ও রক্ষিত আর পরকাল দিবসে অপেক্ষা করছে যে মহান নেয়ামত-তার প্রত্যাশী হে মোমিন ! ভেবে দেখ একবার নিজের অবস্থা, বিবেচনা কর তোমার করণীয়। রমজানের মহান সুযোগ, নিঃসন্দেহ, উম্মতের জন্য গনিমত স্বরূপ! বৎসরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে যা মানুষের এবাদতের সচেতন অনুভূতিকে জাগরূক রাখে ; শক্তি দান করে স্মৃতিকে, উদ্যমী করে তার একান্ত পৃথিবী। এবাদতে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করতে সাহস জোগায়। অপরদিকে, ইতিবাচক এ বিষয়গুলোর পাশাপাশি, নেতিবাচক নানা অপচিন্তা, কর্ম ও পাপ হতে মুক্ত রাখে চিন্তা-চেতনা ও ভাবনাকে। চিত্তবৃত্তি, প্রবৃত্তিপুজা, অনর্থক চাঞ্চল্য-মুক্ত রাখে ইত্যাদি হতে। তাই, রমজান মাসে, আমরা দেখতে পাই, মুসলমানদের এবাদতগাহগুলো লোকে লোকারণ্য-আত্মায়, মননে, কর্মে ও সফেদ চিত্তবৃত্তিতে যারা পরিপূর্ণ মোমিন, পরিশুদ্ধ জাকের, আত্মশুদ্ধির পরাকাষ্ঠা অতিক্রমকারী আল্লাহ-প্রেমিক। সুতরাং, হে মুসলিম ভাই ! রমজান পূর্ণ প্রস্তুতি সহ স্বাগত জানাতে প্রস্তুত হও, সুবর্ণ সময়গুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য নিজেকে গড়ে তোল। সময়গুলো কাজে লাগাবার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে-এসময় আত্মিক, মানসিক ও দেহগত যাবতীয় পাপ হতে কায়মনোবাক্যে তওবা করা, পবিত্র করা নিজেকে গোনাহের তাবৎ অনুষঙ্গ হতে। এবাদত হুকুম-আহকাম বিষয়ে গভীর উপলব্ধি ও জ্ঞান লাভে সচেষ্ট হওয়া। নির্দিষ্ট কর্মপন্থা ও সূচী তৈরি করে সে অনুসারে সময় ও কর্ম বিন্যাস করে সর্বাত্মক ফায়দা হাসিলে উদ্যোগী হবে।

হে আল্লাহ, আমাদের কল্যাণ ব্রতী হওয়ার তওফিক দান করুন, আপনার আনুগত্যে উৎসাহী ও আপনার ক্রোধের উদ্রেককারী যাবতীয় বিষয় পরিহারে আমাদের সহায়তা করুন। আমিন।

ইসলামের দৃষ্টিতে বিশ্ব ভালবাসা দিবস (Valentine day)

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

ালবাসার পরিচয় :

‘ভালবাসা’ এক পবিত্র জিনিস যা আল্লাহ রাববুল আলামীন এর পক্ষ হতে আমরা পেয়েছি। ভালবাসা’ শব্দটি ইতিবাচক। আল্লাহ তা‘আলা সকল ইতিবাচক কর্ম-সম্পাদনকারীকে ভালবাসেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ وَأَحْسِنُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ

‘‘এবং স্বহস্তে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ো না। তোমরা সৎকর্ম কর, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ মুহসিনদের ভালবাসেন।’’(সূরা আল-বাকারা:১৯৫)

ভুলের পর ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং পবিত্রতা অবলম্বন করা এ দুটিই ইতিবাচক কর্ম। তাই আল্লাহ তাওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদেরকেও ভালবাসেন। আল্লাহ বলেন,

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ

‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদেরকে ভালবাসেন।’’(সূরা আল-বাকারা:২২২)

তাকওয়া সকল কল্যাণের মূল। তাই আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে খুবই ভালবাসেন। তিনি বলেন,

فَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِين

‘‘আর নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে ভালবাসেন।’’(সূরা আল ইমরান:৭৬)

পবিত্র এ ভালবাসার সাথে অপবিত্র ও নেতিবাচক কোন কিছুর সংমিশ্রণ হলে তা আর ভালবাসা থাকে না, পবিত্রও থাকে না; বরং তা হয়ে যায় ছলনা,শঠতা ও স্বার্থপরতা।

ভালবাসা, হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা এক অদৃশ্য সুতোর টান। কোন দিন কাউকে না দেখেও যে ভালবাসা হয়; এবং ভালবাসার গভীর টানে রূহের গতির এক দিনের দূরত্ব পেরিয়েও যে দুই মুমিনের সাক্ষাত হতে পারে তা ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার এক বর্ণনা থেকে আমরা পাই। তিনি বলেন,

النعم تكفر والرحم تقطع ولم نر مثل تقارب القلوب

‘‘কত নি‘আমতের না-শুকরি করা হয়, কত আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা হয়, কিন্তু অন্তরসমূহের ঘনিষ্ঠতার মত (শক্তিশালী) কোন কিছু আমি কখনো দেখি নি।’’(ইমাম বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ :হাদীস নং২৬২)

ভালবাসার মানদণ্ড :

কাউকে ভালবাসা এবং কারো সাথে শত্রুতা রাখার মানদণ্ড হলো একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি। শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে ভালবাসতে হবে এবং শত্রুতাও যদি কারো সাথে রাখতে হয়, তাও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই। এটাই শ্রেষ্ঠ কর্মপন্থা। রাসূলুল্লাহ () বলেন,

إِنَّ أَحَبَّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ الْحُبُّ فِي اللَّهِ وَالْبُغْضُ فِي اللَّهِ

‘‘নিশ্চয় আল্লাহর নিকট শ্রেষ্ঠ আমল হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে ভালবাসা এবং শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কারো সাথে শত্রুতা রাখা।’’(আহমদ, মুসনাদুল আনসার, হাদিস নং২০৩৪১)

ঈমানের পরিচয় দিতে হলে, কাউকে ভালবাসবার আগে আল্লাহর জন্য হৃদয়ের গভীরে সুদৃঢ় ভালবাসা রাখতে হবে। কিছু মানুষ এর ব্যতিক্রম করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَمِنْ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ

‘‘আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্যকে আল্লাহ্‌র সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে এবং আল্লাহকে ভালবাসার মত তাদেরকে ভালবাসে; কিন্তু যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ্‌র প্রতি ভালবাসায় তারা সুদৃঢ়।’’(সূরা আল-বাকারা:১৬৫)

শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে ভালবাসতে হবে, নতুবা কোন ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পাবে না। রাসূলুল্লাহ () বলেন,

ثَلَاثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ

‘‘তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকে সে ঈমানের স্বাদ পায়। ১. আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সব কিছু থেকে প্রিয় হওয়া। ২. শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে ভালবাসা। ৩. কুফুরীতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মত অপছন্দ করা।’’(বুখারী, কিতাবুল ঈমান, হাদিস নং:১৫)

আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ভালবাসার ফযীলত :

আল্লাহ রাববুল ইয্‌যতের মহত্ত্বের নিমিত্তে যারা পরস্পর ভালবাসার সম্পর্ক স্থাপন করে, কিয়ামতের দিন তাদেরকে তিনি তাঁর রহমতের ছায়ায় জায়গা দেবেন। রাসূলুল্লাহ () বলেন,

إِنَّ اللَّهَ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَيْنَ الْمُتَحَابُّونَ بِجَلَالِي الْيَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِي ظِلِّي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلِّي

‘‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, আমার মহত্ত্বের নিমিত্তে পরস্পর ভালবাসার সম্পর্ক স্থাপনকারীরা কোথায় ? আজ আমি তাদেরকে আমার বিশেষ ছায়ায় ছায়া দান করব। আজ এমন দিন, যে দিন আমার ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া নেই।’’মুসলিম, কিতাবুল বিররি ওয়াস-সিলাহ, হাদিস নং৪৬৫৫)

রাসূলুল্লাহ () আরও বলেন,

إِنَّ مِنْ عِبَادِ اللَّهِ لَأُنَاسًا مَا هُمْ بِأَنْبِيَاءَ وَلَا شُهَدَاءَ يَغْبِطُهُمُ الْأَنْبِيَاءُ وَالشُّهَدَاءُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِمَكَانِهِمْ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ تُخْبِرُنَا مَنْ هُمْ قَالَ هُمْ قَوْمٌ تَحَابُّوا بِرُوحِ اللَّهِ عَلَى غَيْرِ أَرْحَامٍ بَيْنَهُمْ وَلَا أَمْوَالٍ يَتَعَاطَوْنَهَا فَوَ اللَّهِ إِنَّ وُجُوهَهُمْ لَنُورٌ وَإِنَّهُمْ عَلَى نُورٍ لَا يَخَافُونَ إِذَا خَافَ النَّاسُ وَلَا يَحْزَنُونَ إِذَا حَزِنَ النَّاسُ..

‘‘নিশ্চয় আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছে যারা নবীও নয় শহীদও নয়; কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ হতে তাঁদের সম্মানজনক অবস্থান দেখে নবী এবং শহীদগণও ঈর্ষান্বিত হবে। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল ! আমাদেরকে বলুন, তারা কারা ? তিনি বলেন, তারা ঐ সকল লোক, যারা শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই একে অপরকে ভালবাসে। অথচ তাদের মধ্যে কোন রক্ত সম্পর্কও নেই, এবং কোন অর্থনৈতিক লেন-দেনও নেই। আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় তাঁদের চেহারা হবে নূরানি এবং তারা নূরের মধ্যে থাকবে। যে দিন মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে,সে দিন তাঁদের কোন ভয় থাকবে না। এবং যে দিন মানুষ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকবে, সে দিন তাঁদের কোন চিন্তা থাকবে না..।’’(সুনানু আবী দাঊদ, কিতাবুল বুয়ূ‘, হাদিস নং ৩০৬০)

পরস্পরের মধ্যে ভালবাসা বৃদ্ধি করার উপায় :

ইসলাম বলে, পরস্পরের মধ্যে ভালবাসা ও সৌহার্দ্য স্থাপিত না হলে পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়া যায় না, শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করা যায় না, এমনকি জান্নাতও লাভ করা যাবে না। তাই রাসূলুল্লাহ () মুমিনদের পরস্পরের মধ্যে ভালবাসা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধির জন্য একটি চমৎকার পন্থা বাতলে দিয়েছেন। তিনি বলেন,

لَا تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا أَوَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى شَيْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ..*

‘‘তোমরা বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার না হবে, তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না পরস্পরের মধ্যে ভালবাসা ও সৌহার্দ্য স্থাপন করবে। আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয়ের কথা বলব না, যা করলে তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠিত হবে ? সাহাবীগণ বললেন, নিশ্চয় ইয়া রাসূলাল্লাহ ! (তিনি বললেন) তোমাদের মধ্যে বহুল পরিমাণে সালামের প্রচলন কর।’’(মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদিস নং ৮১)

বিশ্ব ভালবাসা দিবস কি :

ক নোংরা ও জঘন্য ইতিহাসের স্মৃতিচারণের নাম বিশ্ব ভালবাসা দিবস। এ ইতিহাসটির বয়স সতের শত সাঁইত্রিশ বছর হলেও ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’ নামে এর চর্চা শুরু হয় সাম্প্রতিক কালেই। দুই শত সত্তর সালের চৌদ্দই ফেব্রুয়ারির কথা। তখন রোমের সম্রাট ছিলেন ক্লডিয়াস। সে সময় ভ্যালেন্টাইন নামে একজন সাধু, তরুণ প্রেমিকদেরকে গোপন পরিণয়-মন্ত্রে দীক্ষা দিত। এ অপরাধে সম্রাট ক্লডিয়াস সাধু ভ্যালেন্টাইনের শিরশ্ছেদ করেন। তার এ ভ্যালেন্টাইন নাম থেকেই এ দিনটির নাম করণ করা হয় ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ যা আজকের ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’।

বাংলাদেশে এ দিবসটি পালন করা শুরু হয় ১৯৯৩ইং সালে। কিছু ব্যবসায়ীর মদদে এটি প্রথম চালু হয়। অপরিণামদর্শী মিডিয়া কর্মীরা এর ব্যাপক কভারেজ দেয়। আর যায় কোথায় ! লুফে নেয় বাংলার তরুণ-তরুণীরা। এরপর থেকে ঈমানের ঘরে ভালবাসার পরিবর্তে ভুলের বাসা বেঁধে দেয়ার কাজটা যথারীতি চলছে। আর এর ঠিক পিছনেই মানব জাতির আজন্ম শত্রু শয়তান এইডস নামক মরণ-পেয়ালা হাতে নিয়ে দাঁত বের করে হাসছে। মানুষ যখন বিশ্ব ভালবাসা দিবস সম্পর্কে জানত না, তখন পৃথিবীতে ভালবাসার অভাব ছিলনা। আজ পৃথিবীতে ভালবাসার বড় অভাব। তাই দিবস পালন করে ভালবাসার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হয়! আর হবেই না কেন! অপবিত্রতা নোংরামি আর শঠতার মাঝে তো আর ভালবাসা নামক ভালোস্তু থাকতে পারে না। তাই আল্লাহ তা‘আলা মানুষের হৃদয় থেকে ভালবাসা উঠিয়ে নিয়েছেন।

বিশ্ব ভালবাসা দিবসকে চেনার জন্য আরও কিছু বাস্তব নমুনা পেশ করা দরকার। দিনটি যখন আসে তখন শিক্ষাঙ্গনের শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তো একেবারে বেসামাল হয়ে উঠে। নিজেদের রূপা-সৌন্দর্য উজা করে প্রদর্শনের জন্য রাস্তায় নেমে আসে। শুধুই কি তাই ! অঙ্কন পটীয়সীরা উল্কি আঁকার জন্য পসরা সাজিয়ে বসে থাকে রাস্তার ধারে। তাদের সামনে তরুণীরা পিঠ, বাহু আর হস্তদ্বয় মেলে ধরে পছন্দের উল্কিটি এঁকে দেয়ার জন্য। তারপর রাত পর্যন্ত নীরবে-নিবৃতে প্রেমিক বা প্রেমিকার সাথে খোশ গল্প। এ হলো বিশ্ব ভালবাসা দিবসের কর্মসূচি! বিশ্ব ভালবাসা দিবস না বলে বিশ্ব বেহায়াপনা দিবস বললে অন্তত নামকরণটি যথার্থ হতো।

বিশ্ব ভালবাসা দিবস পালনের ক্ষতিকর কিছু দিক :

১. ভালবাসা নামের এ শব্দটির সাথে এক চরিত্রহীন লম্পটের স্মৃতি জড়িয়ে যারা ভালবাসার জয়গান গেয়ে চলেছেন, পৃথিবীবাসীকে তারা সোনার পেয়ালায় করে নীল বিষ পান করিয়ে বেড়াচ্ছেন।

২. তরুণ-তরুণীদের সস্তা যৌন আবেগকে সুড়সুড়ি দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও ফাসাদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভালবাসেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ

‘‘আর তারা তো পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়। আর আল্লাহ ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভালবাসেন না।’’(সূরা আল মায়িদাহ : ৬৪)

৩. নৈতিক অবক্ষয় দাবানলের মত ছড়িয়ে যাচ্ছে।

৪. নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনা জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি লাভ করছে। যারা ঈমানদারদের সমাজে এ ধরণের অশ্লীলতার বিস্তার ঘটায়, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ

‘‘ যারা মু’মিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে তাদের জন্য আছে দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি..।’’(সূরা আন-নূর :১৯)

বস্তত যে সমাজেই চরিত্র-হীনতার কাজ ব্যাপক, তথায় আল্লাহর নিকট থেকে কঠিন আযাব সমূহ ক্রমাগত অবতীর্ণ হওয়া অবধারিত, আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন :

... لَمْ تَظْهَرِ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ حَتَّى يُعْلِنُوا بِهَا إِلَّا فَشَا فِيهِمُ الطَّاعُونُ وَالْأَوْجَاعُ الَّتِي لَمْ تَكُنْ مَضَتْ فِي أَسْلَافِهِمِ...

‘‘যে জনগোষ্ঠীর মধ্যে নির্লজ্জতা প্রকাশমান, পরে তারা তারই ব্যাপক প্রচারেরও ব্যবস্থা করে, যার অনিবার্য পরিণতি স্বরূপ মহামারি, সংক্রামক রোগ এবং ক্ষুধা-দুর্ভিক্ষ এত প্রকট হয়ে দেখা দিবে, যা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে কখনই দেখা যায় নি।’’(ইবনু মাজা, কিতাবুল ফিতান, হাদিস নং-৪০০৯)

৫. তরুণ-তরুণীরা বিবাহ পূর্ব দৈহিক সম্পর্ক গড়তে কোন রকম কুণ্ঠাবোধ করছে না। অথচ তরুণ ইউসুফ আলাইহিস সালামকে যখন মিশরের এক রানী অভিসারে ডেকেছিল, তখন তিনি কারাবরণকেই এহেন অপকর্মের চেয়ে উত্তম জ্ঞান করেছিলেন। রোমান্টিক অথচ যুব-চরিত্রকে পবিত্র রাখার জন্য কী অতুলনীয় দৃষ্টান্ত! আল্লাহ জাল্লা শানুহু সূরা ইউসুফের ২৩-৩৪ নম্বর আয়াত পর্যন্ত এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন এ ভাবে- ‘‘সে যে স্ত্রীলোকের ঘরে ছিল সে তার কাছ থেকে অসৎকাজ কামনা করল ও দরজাগুলো বন্ধ করে দিল এবং বলল, ‘আস।’ সে বলল, ‘আমি আল্লাহ্‌র আশ্রয় প্রার্থনা করছি, তিনি আমার প্রভু; তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয়ই সীমালঙ্ঘনকারীরা সফলকাম হয় না। সে রমণী তো তার প্রতি আসক্ত হয়েছিল এবং সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ত যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন দেখতে পেত। আমি তাকে মন্দ-কাজ ও অশ্লীলতা হতে বিরত রাখার জন্য এভাবে নিদর্শন দেখিয়েছিলাম। সে তো ছিল আমার বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। ওরা উভয়ে দৌড়ে দরজার দিকে গেল এবং স্ত্রীলোটি পিছন হতে তার জামা ছিঁড়ে ফেলল, তারা স্ত্রীলোকটির স্বামীকে দরজার কাছে পেল। স্ত্রীলোকটি বলল, ‘যে তোমার পরিবারের সাথে কুকর্ম কামনা করে তার জন্য কারাগারে প্রেরণ বা অন্য কোন মর্মন্তুদ শাস্তি ছাড়া আর কি দণ্ড হতে পারে? ইউসুফ বলল, ‘সে-ই আমার কাছ থেকে অসৎকাজ কামনা করছিল।’ স্ত্রীলোকটির পরিবারের একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিল, ‘যদি তার জামার সামনের দিক থেকে ছিঁড়ে থাকে তবে স্ত্রীলোকটি সত্য কথা বলেছে এবং পুরুষটি মিথ্যাবাদী, কিন্তু তার জামা যদি পিছন দিক থেকে ছিঁড়ে থাকে তবে স্ত্রীলোকটি মিথ্যা বলেছে এবং পুরুষটি সত্যবাদী। গৃহস্বামী যখন দেখল যে, তার জামা পিছন দিক থেকে ছেঁড়া হয়েছে তখন সে বলল, ‘নিশ্চয়ই এটা তোমাদের নারীদের ছলনা, তোমাদের ছলনা তো ভীষণ। হে ইউসুফ! তুমি এটা এড়িয়ে যাও এবং হে নারী! তুমি তোমার অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর; তুমিই তো অপরাধী। নগরের কিছু সংখ্যক নারী বলল, ‘আযীযের স্ত্রী তার যুবক দাস হতে অসৎকাজ কামনা করছে, প্রেম তাকে উন্মত্ত করেছে, আমরা তো তাকে স্পষ্ট ভুলের মধ্যে দেখছি। স্ত্রীলোকটি যখন ওদের কানা-ঘুষার কথা শুনল, তখন সে ওদেরকে ডেকে পাঠাল, ওদের জন্য আসন প্রস্তুত করল, ওদের সবাইকে একটি করে ছুরি দিল এবং ইউসুফকে বলল, ‘ওদের সামনে বের হও।’ তারপর ওরা যখন তাঁকে দেখল তখন ওরা তাঁর সৌন্দর্যে অভিভূত হল এবং নিজেদের হাত কেটে ফেলল। ওরা বলল, ‘অদ্ভুত আল্লাহমাহাত্ম্য! এ তো মানুষ নয়, এ তো এক মহিমান্বিত ফেরেশতা। সে বলল, ‘এ-ই সে যার সম্বন্ধে তোমরা আমার নিন্দা করেছ। আমি তো তার থেকে অসৎকাজ কামনা করেছি। কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে; আমি তাকে যা আদেশ করেছি সে যদি তা না করে, তবে সে কারারুদ্ধ হবেই এবং হীনদের অন্তর্ভুক্ত হবে। ইউসুফ বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! এ নারীরা আমাকে যার দিকে ডাকছে তার চেয়ে কারাগার আমার কাছে বেশী প্রিয়। আপনি যদি ওদের ছলনা হতে আমাকে রক্ষা না করেন তবে আমি ওদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হব। তারপর তার প্রতিপালক তার ডাকে সাড়া দিলেন এবং তাকে ওদের ছলনা হতে রক্ষা করলেন। তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।(অনুবাদ, সূরা ইউসুফ : ২৩-৩৪)

৬. শরীরে উল্কি আঁকাতে যেয়ে নিজের ইয্‌যত-আব্রু পরপুরুষকে দেখানো হয়। যা প্রকাশ্য কবিরা গুনাহ। যে ব্যক্তি উল্কি আঁকে এবং যার গায়ে তা আঁকা হয়, উভয়য়ের উপরই আল্লাহর লা‘নত বর্ষিত হয়। রাসূলুল্লাহ () বলেন,

لَعَنَ اللَّهُ الْوَاصِلَةَ وَالْمُسْتَوْصِلَةَ وَالْوَاشِمَةَ وَالْمُسْتَوْشِمَةَ *

‘‘যে ব্যক্তি পর-চুলা লাগায় এবং যাকে লাগায়; এবং যে ব্যক্তি উল্কি আঁকে এবং যার গায়ে আঁকে, আল্লাহ তাদেরকে অভিসম্পাত করেন।’’(বুখারী,কিতাবুল লিবাস,হাদিস নং৫৪৭৭)

মূলত যার লজ্জা নেই, তার পক্ষে এহেন কাজ নেই যা করা সম্ভব নয়। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إِذَا لَمْ تَسْتَحِ فَاصْنَعْ مَا شِئْت

‘‘যদি তোমার লজ্জা না থাকে তাহলে যা ইচ্ছা তাই করতে পার।’’(বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া, হাদিস নং৩২২৫)

৭. ভালবাসা দিবসের নামে নির্লজ্জতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে যিনা-ব্যভিচার, ধর্ষণ ও খুন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

... وَلَا فَشَا الزِّنَا فِي قَوْمٍ قَطُّ إِلَّا كَثُرَ فِيهِمُ الْمَوْتُ...

‘‘যে জনগোষ্ঠীর-মধ্যেই ব্যভিচার ব্যাপক হবে, তথায় মৃত্যুর ধিক্য ব্যাপক হয়ে দেখা দেবে।’’(মুয়াত্তা মালিক, কিতাবুল জিহাদ, হাদিস নং-৮৭০)

উপরোক্ত আয়াত ও হাদিসগুলোর ভাষ্য কতটা বাস্তব বর্তমান বিশ্বের বাস্তব চিত্র এর প্রমাণ বহন করেঅবাধ যৌন মিলনের ফলে "AIDS" নামক একটি রোগ বর্তমানে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এটা এমনি মারাত্মক যে, এ রোগে আক্রান্ত হলে এর কোন আরোগ্য নেই। কিছু পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে :

1. বিশ্বের ১৪০ কোটিরও বেশী লোক থেকে ১৯৮৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত এক লক্ষ এগার হাজারেরও বেশী "AIDS" রোগীর তালিকা পাওয়া গিয়েছে।’’(আব্দুল খালেক, নারী,(ই,ফা,বা.ঢাকা,১৯৮৪ইং) পৃ. ৯৬)

2. ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ২,৪২,০০০ এইডস রোগীর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। এর মধ্যে ১,৬০,০০০ মৃত্যু বরণ করেছিল। ১৯৯২ সালের গবেষণালব্ধ তথ্য মতে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ৫০ লক্ষ্য এইডস রোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।(Baron& Byrne, Ibid., P. 329)

3. ৩০ শে ডিসেম্বর ১৯৯৬ এর Time International’ পত্রিকায় পরিবেশিত তথ্য মতে, ৬৫ লক্ষ জীবন ছিনিয়ে নিয়েছে এই ঘাতক ব্যাধি। আগামী ৫ বৎসরে আরও ৩ কোটি লোক মারা যাবে এই রোগে।(মাসিক পৃথিবী, (ঢাকা, ডিসেম্বর, ১৯৯৯), পৃ. ৫)

4. বিশ্ব এইডস দিবস ২০০০-এর প্রাক্কালে জাতিসংঘ যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তাতে বলা হয়েছে : ‘‘ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক সেবনকারী এবং সমকামিতা, ইতর রীতির যৌনতার মাধ্যমে পূর্ব ইউরোপ, রাশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, ল্যাটিন-আমেরিকা ক্যারিবীয় অঞ্চল ও এশিয়ায় এইডস দেখা দিয়েছে। আফ্রিকার কয়েকটি দেশে প্রতি তিনজনের একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ এইডস আক্রান্ত। শিশুদের ৮০ ভাগ এই রোগের ভাইরাসে আক্রান্ত। আফ্রিকার উপ-সাহারা এলাকায় এ বছর ১০ লাখেরও বেশী লোক এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে নতুন করে এইডস দেখা দিয়েছে। মাত্র একবছরে এইডস রোগীর সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্য প্রাচ্যেও নতুন করে এইডস সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে।’’(রয়টার্স, দৈনিক ইনকিলাব, (ঢাকা, ২রা ডিসেম্বর ২০০০ ইং) পৃ .১-২)

5. ৬. জাতিসংঘের দেয়া তথ্য মতে : ‘‘বিশ্বে ৩ কোটি ৬০ লাখ লোক এইডসে আক্রান্ত ২০০০ইং সনে ৫০ লাখ লোক নতুন করে এইডসে আক্রান্ত হয়েছে।’’(প্রাগুক্ত)

6. ৭. ‘‘বিশ্ব এইডস দিবসের আলোচনা সভায় (ঢাকা) বাংলাদেশের তৎকালীন সমাজকল্যাণ, প্রতি মন্ত্রী ড. মোজাম্মেল হোসেনের দেয়া তথ্য মতে, বাংলাদেশে এইডস ভাইরাস বহনকারী রোগীর সংখ্যা একুশ হাজারের বেশী।’’(দৈনিক ইনকিলাব, (স্টাফ রিপোর্টার, বিশ্ব এইডস দিবসে ঢাকায় আলোচনা সভা, ২রা ডিসেম্বর, ২০০০ ইং) পৃ.১)

সিফিলিস-প্রমেহ : বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আমেরিকার শতকরা ৯০% অধিবাসী রতিজ দুষ্ট ব্যধিতে আক্রান্ত। সেখানকার সরকারী হাসপাতালগুলিতে প্রতি বৎসর গড়ে দুই লক্ষ সিফিলিস এবং এক লক্ষ ষাট হাজার প্রমেহ রোগীর চিকিৎসা করা হয়। (Encyclopedia Britannica, V. 23, P. 45.) এছাড়াও আমেরিকায় প্রতি বৎসর ত্রিশ-চল্লিশ হাজার শিশু জন্মগত সিফিলিস রোগে মৃত্যুবরণ করে। ( আঃ খালেক, নারী, (ঢাকা : ই.ফা. বা., ১৯৮৪ ইং), পৃ. ৯৬)

Dr. Laredde বলেন ফ্রান্সে প্রতি বৎসর কেবল সিফিলিস ও তদ-জনিত রোগে ত্রিশ হাজার লোক মারা যায়। (প্রাগুক্ত)

হার্পিস রোগ :

ব্যভিচারের কারণে জননেন্দ্রিয়ে সৃষ্ট অত্যন্ত পীড়াদায়ক রোগ হলো Genital Herpes. মার্কিন জনসংখ্যার শতকরা দশ ভাগ (জনসংখ্যা ২৬ কোটি ধরলে তার ১০% হয় ২ কোটি ৬০ লক্ষ) এই রোগে আক্রান্ত। এটাই সব নয়। প্রত্যেক বৎসর প্রায় ৫০০,০০০ মানুষের নাম এই মারাত্মক হার্পিস রোগীদের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। (Baron & Byrne, Social psychology : Understanding Human Interaction, P. 329.)

৮. বিশ্ব ভালবাসা দিবসের এসব ঈমান বিধ্বংসী কর্ম-কাণ্ডের ফলে মুসলিম যুব-মানস ক্রমশ ঈমানি বল ও চেতনা হারিয়ে ফেলছে।

৯. মানুষের হৃদয় থেকে তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয় উঠে যাচ্ছে।

প্রিয় মুমিন-মুসলিম ভাই-বোনেরা ! ভালবাসা কোন পর্বীয় বিষয় নয়। এটি মানব জীবনের সুখ-শান্তির জন্য একটি জরুরি সার্বক্ষণিক মানবিক উপাদান। সুতরাং আমাদের মধ্যে ভালবাসা ও সৌহার্দ বৃদ্ধির জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শিখানো সার্বক্ষণিক পন্থাটি অবম্বন করি।

বিশ্ব ভালবাসা দিবসের নামে এসব ঈমান বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড হতে আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে হেফাযত করুন। শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই যেন কাউকে ভালবাসি এবং শত্রুতাও যদি কারো সাথে রাখতে হয়, তাও যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই রাখি। আমীন !!!

সুত্র