ইসরাইল রাষ্ট্র জন্মের ইতিহাস । ইসরাইল জন্মের পটভুমি
নাজ
পাশ্চাত্য আজকাল সন্ত্রাসবাদকে বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য
সবচেয়ে বড় হুমকি বলে দাবি করছে। অথচ ইহুদিবাদী ইসরাইল সন্ত্রাসবাদের জোরে ও জবর দখলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও ইসরাইলকে সন্ত্রাসী এবং বর্ণবাদী হিসেবে অভিহিত না করে পাশ্চাত্য ও ইহুদিবাদী মহল দখলদারদের হাত থেকে মাতৃভূমিকে উদ্ধারের জন্য সংগ্রামরত ফিলিস্তিনিদেরকেই সন্ত্রাসী বলে অপবাদ দিচ্ছে। পাশ্চাত্য ও তাদের প্রচার মাধ্যম গোয়েবলসীয় প্রচার-প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে সন্ত্রাসী এবং দখলদার ইসরাইলকে মজলুম বলে তুলে ধরছে, অন্যদিকে ফিলিস্তিনি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামকে সন্ত্রাসবাদ বলে প্রচার করছে। অথচ বাস্তবতা ও বাস্তব ইতিহাস সম্পূর্ণ উল্টো চিত্রই তুলে ধরে। ইসরাইল সৃষ্টির আগ থেকেই ইহুদিবাদী নানা গ্রুপ সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা চালিয়ে অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টির পটভূমি তৈরি করেছিল।
ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ সব সময়ই পাশ্চাত্যের পৃষ্ঠপোষকতা বা মদদ পেয়েছে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার অজুহাত দেখিয়ে পাশ্চাত্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান সন্ত্রাসী শক্তি হিসেবে ইসরাইলকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাই পাশ্চাত্য সন্ত্রাসবাদের বিরোধী- এমন দাবি নির্জলা মিথ্যা ও বড় ধরনের প্রতারণা মাত্র। দেশে দেশে হস্তক্ষেপের অজুহাত হিসেবেই সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার শ্লোগান দিয়ে থাকে মার্কিন সরকারসহ অন্য পশ্চিমা শক্তিগুলো।
মানবজাতির সূচনালগ্ন থেকেই সন্ত্রাসবাদের অস্তিত্ব ছিল। অবৈধভাবে বল প্রয়োগ করে বা বল প্রয়োগের ভয় দেখিয়ে বিশেষ কোনো অশুভ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের প্রচেষ্টার নামই সন্ত্রাস। মার্কিন সরকারসহ পাশ্চাত্যের সরকারগুলো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার মত বিষয়গুলোকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বা আধিপত্য বিস্তারের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে। আধিপত্য ও কর্তৃত্ব বিস্তারের জন্য এই শক্তিগুলো যে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী পদক্ষেপ নিতে দ্বিধান্বিত হয় না। ওই পশ্চিমা দেশগুলো ইহুদিবাদী ইসরাইলের সন্ত্রাসী তৎপরতারও প্রধান সহযোগী। ইহুদিবাদী ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতি পাশ্চাত্যের অন্ধ সমর্থন সন্ত্রাসবাদের ব্যাপারে তাদের দ্বিমুখী নীতির অন্যতম বড় প্রমাণ।
অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল সৃষ্টির আগে ও পরে ইহুদিবাদীরা অনেক গণহত্যা অভিযানসহ বহু সন্ত্রাসী তৎপরতা চালিয়েছে এবং এখনও সেই ধারা কখনও তীব্র ও কখনও ধীর গতিতে অব্যাহত রেখেছে। ইসরাইল মজলুম ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের জন্য গত প্রায় ৬০ বছর ধরে যেসব পরিকল্পিত গণহত্যা চালিয়েছে বিশ্ব অঙ্গনে তা তেমন একটা প্রচারিত হয়নি। ফলে ওইসব গণহত্যা তথাকথিত হলোকাস্টের চেয়ে বেশি নৃশংস হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী যথাযথ প্রতিক্রিয়া গড়ে ওঠেনি। অবশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব জনমত ইহুদিবাদী ইসরাইলের সন্ত্রাসী চরিত্র সম্পর্কে আগের চেয়েও বেশি সচেতন হয়ে উঠেছে।
আধুনিক যুগের এই পর্যায়ে শত সহস্র পত্র-পত্রিকা, রেডিও, স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও ইন্টারনেট মাধ্যমের ওপর ইহুদিবাদী মহলসহ সাম্রাজ্যবাদী মহলগুলোর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও ইসরাইলি অপরাধযজ্ঞ আর ঢেকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ইসরাইলি অপরাধযজ্ঞের ব্যাপারে বিশ্ব জনমতের প্রতিবাদ ক্রমেই এতটা সোচ্চার হয়ে উঠছে যে খোদ পশ্চিমা সরকারগুলোও এখন ইসরাইলের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার ব্যাপারে সংকট ও প্রতিকূল চাপের সম্মুখীন।
ইহুদিবাদ বা যায়োনিজম বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ানক ও কূখ্যাত মতবাদ। "যায়ন" শব্দটি নেয়া হয়েছে বায়তুল মোকাদ্দাসের "যায়ন" বা "সাহইয়ুন" নামক পাহাড় থেকে। অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল সৃষ্টির নীলনক্সার হোতারা তাদের সংগঠন বা আন্দোলনের নাম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ওই শব্দটি যাতে সারা বিশ্বের ইহুদিদের ফিলিস্তিনে জড় করা যায়। খৃস্টিয় উনবিংশ শতকের শেষ দিকে ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয় যায়োনিস্ট সংস্থা বা ইহুদিবাদী আন্দোলন। এই তৎপরতার উদ্যোক্তা ছিলেন থিওডোর হারজেল নামের হাঙ্গেরিয় এক ইহুদি সাংবাদিক। ১৮৯৭ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বের ইহুদিদের প্রথম কংগ্রেসে হারজেল বলেছেন, "যায়োনিজম বা ইহুদিবাদ ইহুদিদের একটি আন্দোলন, যার লক্ষ্য ফিলিস্তিনে পৌঁছা।" অন্য কথায় এ আন্দোলনকে ইহুদিদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রূপ দেয়া হয়। হারজেল ইহুদিবাদকে একটি ধর্মীয় পরিভাষা থেকে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশলে রূপান্তরিত করেন। তিনি মনে করতেন, বাইরের চাপ সত্ত্বেও ইহুদিরা ফিলিস্তিনে ইহুদিদের একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রচেষ্টা মেনে নিতে বাধ্য হবে এবং তারা ফিলিস্তিনে স্থিতিশীল বা সুখময় জীবন যাপন করবে।
১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের বাসেল শহরে অনুষ্ঠিত বিশ্বের ইহুদিদের প্রথম কংগ্রেসে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের একটি জাতীয় সরকার গঠনকে ইহুদিবাদীদের লক্ষ্য বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়। ভিয়েনায় ইহুদিবাদীদের অনেক দপ্তর ছিল এবং হারজেলের কার্যালয়ও ছিল সেখানে। ১৯০১ সাল থেকে এখনও প্রতি দুই বছর পর একবার ভিয়েনায় বিশ্বের ইহুদিদের কংগ্রেস বা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সে যুগে ইহুদিবাদীদের মধ্যে ইহুদিরা ছিল সংখ্যালঘু। কেবল পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের একদল ইহুদি তাদের সমর্থন করত। "হাসকালা" আন্দোলন ছিল ইহুদিবাদ বিরোধী ইহুদিদের প্রধান দল। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন ইহুদিদেরকে ইউরোপীয় সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে একাত্ম করতে চেয়েছিল। কারণ, ইহুদিরা ইউরোপীয় সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় একঘরে হয়ে পড়েছিল ইউরোপে। এই আন্দোলন সামাজিক ক্ষেত্রে ইউরোপের ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ও সংস্কৃতি চালু করতে চেয়েছিল ইহুদিদের মধ্যে। আধুনিক সংস্কৃতির সাথে তাল মিলিয়ে বৃহত্তর ইহুদি সংস্কৃতি চালু করা ছিল হাসকালা আন্দোলনের লক্ষ্য।
হারজেল ওই লক্ষ্যকে কাঙ্ক্ষিত মনে করলেও গোটা ইউরোপ জুড়ে ইহুদি-বিরোধী মনোভাব ব্যাপক মাত্রায় বিরাজ করায় ইউরোপীয় সমাজে ইহুদিদের মিশে যাওয়ায় প্রচেষ্টা সফল হবে না বলে মনে করতেন।
ইহুদিবাদী বা যায়োনিস্টরা সংখ্যায় কম হলেও তারা ছিল সুসংগঠিত এবং বিপুল অর্থ ও বিত্তের অধিকারী। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় তাদের পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হত। ব্যাপক প্রচারণা ও কূট-কৌশল ইহুদিবাদীদের নানা সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ।
দুই.
আজ আমরা ফিলিস্তিনের ভূখন্ডগুলো কব্জা করার ক্ষেত্রে ইহুদিবাদী নেতা হার্জেলের রাজনৈতিক প্রচেষ্টা সম্পর্কে আলোচনা করব।
ফিলিস্তিনে ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টির লক্ষ্যে থিওডোর হারজেল প্রথমে তুরস্কের সুলতান আবদুল হামিদ ওসমানিকে ওই অঞ্চলকে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করার এবং সেখানে ইহুদিদের অভিবাসনের সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু ওসমানিয় খেলাফতের শেষ সুলতান আবদুল হামিদ হারজেলের ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এ অবস্থায় হারজেল বৃটেনের শরণাপন্ন হন। বৃটেন উগান্ডার একটি জনমানবহীন অঞ্চল ইহুদিদের জন্য ছেড়ে দিতে সম্মত হয়। খুব অল্প সংখ্যক ইহুদিবাদী বৃটেনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। হারজেলসহ বেশির ভাগ ইহুদিবাদী ফিলিস্তিনকে তাদের কাছে হস্তান্তরের দাবির ওপর অটল থাকে। হারজেল ১৯০৪ সালে মারা যান
১৯০৫ সালে ইহুদিবাদীদের কংগ্রেস ফিলিস্তিন ছাড়া অন্য কোনো অঞ্চলে "ইহুদি রাষ্ট্র" প্রতিষ্ঠা গ্রহণযোগ্য নয় বলে ঘোষণা করে। হারজেলের মৃত্যুর পর ইহুদিবাদীদের প্রধান কেন্দ্র ভিয়েনা থেকে কোলন ও পরে বার্লিনে এবং আরো পরে লন্ডনে স্থানান্তরিত হয়। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের আগে ইহুদিবাদী মতবাদের অল্প কিছু সমর্থক ছিল রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে, বিশেষ করে পোলান্ডের ইহুদিদের মধ্যে। কিন্তু তাদেরকে পরিচালিত করত জার্মানী ও অস্ট্রিয়ার ইহুদিরা। ***ইসরাইল রাষ্ট্র জন্মের ইতিহাস**
১৯০৫ সালে রাশিয়ায় একটি বিপ্লব ব্যর্থ হয়। এ অবস্থায় রাশিয়ার জার সরকারের চাপের মুখে একদল ইহুদি যুবক ফিলিস্তিনে অভিবাসন করে। ১৯১৪ সালে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯০ হাজার এবং অভিবাসীদের কয়েকটি বসতিতে প্রায় ১৩ হাজার ইহুদি বাস করত। ওই অভিবাসীদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন "ব্রাউন এডমন্ড রথসচাইল্ড" নামের এক ফরাসি ইহুদি ধনকুবের। ইহুদিবাদী মতবাদ উদ্ভাবন ও তার বিস্তারে গুরূত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এই ইহুদিবাদী পুঁজিপতি। রথসচাইল্ডকে "ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি প্রতিষ্ঠার জনক" বলা হয়।
ফিলিস্তিনে আরবদের জমিসহ বিভিন্ন জমি কেনা এবং সেখানে অভিবাসী ইহুদিদের জন্য উপশহর বা বসতি নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রচেষ্টার জন্য ইহুদিবাদীদের মধ্যে স্মরণীয় হয়ে আছেন ওই ফরাসি ইহুদি ধনকুবের। ফিলিস্তিনে অভিবাসী ইহুদিদের জন্য প্রথম উপশহর নির্মাণে তিনি ব্যয় করেছিলেন ১৬ লাখ লিরা স্টার্লিং। রথসচাইল্ড নিজেই বলেছেন, "আমাকে ছাড়া ইহুদিবাদীরা কোনো কাজই করতে পারত না।"
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিবাদ খুব দ্রুত বিস্তৃত হয়। সে সময় ইহুদিবাদীদের নেতৃত্ব দিত বৃটেনে বসবাসরত রুশ ইহুদিরা। ইহুদিবাদীদের তৎকালীন নেতা হাইম ওয়াইজম্যান ফিলিস্তিনে ইহুদিদের একটি জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বৃটেনের প্রতিশ্রুতি আদায়ে সক্রিয় ছিলেন। হাইম ওয়াইজম্যান ছিলেন হারজেলের পর ইহুদিবাদীদের সবচেয়ে বড় নেতা। কারণ, হারজেলের পর ওয়াইজম্যান বিশ্ব ইহুদিবাদ সংস্থার প্রধান এবং এরপর ফিলিস্তিনে ইহুদি এজেন্সির সভাপতি ও আরো পরে অবৈধ ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তার প্রথম প্রেসিডেন্ট হন। বৃটিশ নৌবাহিনীর উন্নয়নে অবদান রাখার পুরস্কার হিসেবে ওয়াইজম্যান বৃটিশ সরকারকে দিয়ে কুখ্যাত "বেলফোর ঘোষণা" আদায় করার পথ সুগম করেছিলেন। বৃটেনের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলফোর ১৯১৭ সালে দেয়া এক ঘোষণায় ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইহুদিদের প্রতি বৃটেনের সমর্থন দেয়ার প্রতিশ্রতি দেন। আর ওই ঘোষণার মধ্য দিয়েই অবৈধ, আগ্রাসী ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইহুদিবাদী ইসরাইলের বীজ বপন করা হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বৃটেন ও তুরস্কের ওসমানি খেলাফতের মধ্যে সংঘাতে লাভবান হয় ইহুদিবাদী উগ্র ইহুদিরা। ওই বিশ্বযুদ্ধের পর ওসমানি খেলাফতভুক্ত বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্য টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে। ফিলিস্তিনের তত্ত্বাবধায়ক হয় বৃটেন। এভাবে ক্রমেই বেলফোর ঘোষণা বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত হয়। একইসাথে ফিলিস্তিনে অভিবাসী ইহুদিরা নতুন নতুন বসতি ও উপশহর নির্মাণ অব্যাহত রাখে। ইহুদিবাদীরা ফিলিস্তিনে নানা সংস্থা, সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে থাকে স্বাধীনভাবে। ১৯২৫ সালেও ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ ৮ হাজার। ১৯৩৩ সালে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা দুই লাখ ৩৮ হাজারে উন্নীত হয়। এই সংখ্যা ছিল ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যার শতকরা বিশ ভাগ। হিটলারের আবির্ভাব ঘটার আগ পর্যন্ত ফিলিস্তিনে ইহুদিদের অভিবাসন ছিল অত্যন্ত ধীরগতি সম্পন্ন। কিন্তু ইহুদিদের ওপর জার্মান নাৎসিদের চাপ বৃদ্ধির ফলে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের অভিবাসনের গতি তীব্র হয়ে ওঠে।
ফিলিস্তিনের মুসলমানরা তাদের দেশে ইহুদিদের অভিবাসনের বিপদ এবং ইহুদিবাদীদের প্রতি বৃটিশ সরকারের সমর্থনের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তারা ১৯২৯ সাল থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত বেশ কয়েকবার বিদ্রোহ ও বিক্ষোভ করে। ওইসব বিক্ষোভ ও বিদ্রোহ বৃটেনকে বেশ বেকায়দায় ফেলে দেয়। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের মধ্যে অনৈক্য এবং তাদের প্রতি আরব ও মুসলিম সরকারগুলোর সমর্থনের অভাবের ফলে ফিলিস্তিনিদের ইহুদিবাদ-বিরোধী আন্দোলন নিস্ফল হয়।
এরিমধ্যে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ওই যুদ্ধ চলাকালে জার্মানীর নাৎসি ক্যাম্পগুলোতে কয়েক মিলিয়ন ইহুদি নিহত হওয়ার অতিরঞ্জিত দাবি প্রচার করে ইহুদিবাদীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের সমর্থকের সংখ্যা বাড়াতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে পুঁজিপতি মার্কিন ইহুদিরা ইহুদিবাদীদের ব্যাপক মাত্রায় অর্থ সাহায্য দিতে থাকে এবং এভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইহুদিবাদীদের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ফিলিস্তিনি মুসলমান ও দখলদার ইহুদিবাদীদের মধ্যে বিরোধ তুঙ্গে উঠলে বৃটিশ সরকার ফিলিস্তিন সংকটের বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করে এবং ফিলিস্তিনে একটি আরব ও একটি ইহুদি সরকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয়। ওই প্রস্তাবে জেরুজালেম বা বায়তুল মোকাদ্দাসকে আন্তর্জাতিক শহর হিসেবে ঘোষণা দেয়ার কথা বলা হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় সরকারগুলোর চাপের মুখে জাতিসংঘ বৃটেনের ওই প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং নিরাপত্তা পরিষদ এ ব্যাপারে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। জাতিসংঘ প্রথম থেকেই মূলতঃ এই শক্তিগুলোর কর্তৃত্বাধীন ছিল। ওই প্রস্তাব পাশ হওয়ার পর পরই ১৯৪৮ সালের মে মাসে ফিলিস্তিনি ভূখন্ডে ইহুদিবাদী ইসরাইল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয়া হয়। এভাবে ইহুদিবাদীদের প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার ৫০ বছর পর ইহুদিবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল ও তার সরকার গঠিত হবার ঘোষণা প্রচারের পর পরই তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইহুদিবাদী সরকারের প্রতি স্বীকৃতি দেন এবং এই সরকারের প্রতি মার্কিন সহায়তার কথাও ঘোষণা করেন। ফলে ইসরাইল অভিমুখে মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক সাহায্যের ঢল নামে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল ইহুদিবাদী ইসরাইলকে স্বীকৃতি দানকারী তৃতীয় দেশ। ওই সময় থেকে ইসরাইলে সোভিয়েত সাহায্যের পরিমাণও ছিল ব্যাপক ও উল্লেখযোগ্য।
দখলদার ইসরাইল গঠিত হবার পর ইহুদিবাদী সংস্থাগুলো বিশ্বের ইহুদিদের ইসরাইলে জড় হওয়ার জন্য উৎসাহ দিতে থাকে। আর এই লক্ষ্যে তারা মিশরের নীল নদ থেকে ইরাকের ফোরাত নদীর তীর পর্যন্ত বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনার কথাও প্রচার করতে থাকে। ইহুদিবাদীরা ফিলিস্তিনে মুসলমানদের সব ধরনের স্থাবর অস্থাবর সম্পদ দখল করে এবং তাদের গ্রাম ও পবিত্র স্থাপনাগুলো এত নৃশংসভাবে ধ্বংস করে যে এর ফলে প্রায় ৫০ লাখ ফিলিস্তিনি আশপাশের আরব দেশগুলোতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
তিন.
অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল গঠনের জন্য যেসব প্রধান পন্থা ও চালিকাশক্তি ব্যবহার করা হয়েছে সেসবের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ও হত্যাযজ্ঞ অন্যতম। ফিলিস্তিনে অবৈধ ওই রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে ভীত-সন্ত্রস্ত করা, গুপ্ত হত্যা, অপহরণ এবং গণহত্যার মত সন্ত্রাসবাদের সব পন্থাই ইহুদিবাদীরা ব্যাবহার করেছে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে। ওইসব সন্ত্রাসী তৎপরতায় জড়িত ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম যে গ্রুপটি আত্মপ্রকাশ করেছিল সেটির নাম ছিল "হ'গানাহ"। ১৯২১ সালে গঠিত এই গ্রুপটির কাজ ছিল জমি বিক্রি করতে ও ঘর-বাড়ী ত্যাগ করতে ফিলিস্তিনিদের বাধ্য করা। "প্রতিরক্ষা ও অভিযান" নাম নিয়ে প্রকাশ্যে ও গোপনে তৎপরতা চালাত সন্ত্রাসী গ্রুপ "হ'গানাহ"। কিছুদিন পর "হ'গানাহ" ইহুদি এজেন্সির অঘোষিত সামরিক শাখায় পরিণত হয়। ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালানো ছিল এর নতুন দায়িত্ব। পরে ওই গ্রুপটি " "শাঈ" নামের একটি গোয়েন্দা গ্রুপ গঠন করে। ফিলিস্তিন ও আরব দেশগুলোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামরিক সংগ্রামের লক্ষ্যে ইহুদিবাদী নেতাদের জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা ছিল "শাঈ" গ্রুপের কাজ। ফিলিস্তিনি মুসলমানদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালানোর পাশাপাশি অভিবাসী বা বহিরাগত ইহুদিদের জন্য ফিলিস্তিনিদের ঘর-বাড়ী দখল করাও ছিল হ'গানাহ'র আরেকটি দায়িত্ব।
১৯৩১ সালে সন্ত্রাসী ইহুদিবাদী দল হগানাহ'র একদল সদস্য ও "বিতাদ" নামের অন্য একটি সন্ত্রাসী ইহুদিবাদী দলের কিছু সদস্য মিলে গঠন করে ভয়াবহ সন্ত্রাসী দল " ইরগুন"। ইরগুনের প্রধান ছিলেন ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোনাচেম বেগিন। ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালানো ও তাদের শরণার্থীতে পরিণত করাসহ ইহুদিবাদী ইসরাইল গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল বেগিন। " কেবল অস্ত্র দিয়ে " - এ কথাটি ছিল ইরগুনের শ্লোগান। আর এই শ্লোগানের নিচে সাংকেতিক নক্সায় লেখা থাকতো " কেবল এটাই"।
১৯৪৮ সালে অবৈধ ইহুদিবাদী ইসরাইল রাষ্ট্র ঘোষণার পর ভেঙ্গে দেয়া হয় "হ'গানাহ"।
হগানাহ, বিতাদ ও ইরগুনের পাশাপাশি ইহুদিবাদীদের আরেকটি বড় বা কুখ্যাত সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম ছিল ওয়েস্টার্ন। ওইসব ভয়াবহ সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য বা নেতা ছিলেন সাবেক তিন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী (প্রয়াত) মোনাচেম বেগিন, (বেশ কয়েক বছর ধরে সংজ্ঞাহীন) এরিয়েল শ্যারন, ও (প্রয়াত) ইসহাক শামির। প্রয়াত ইসরাইলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোশে দায়ানও ছিলেন ওইসব গ্রুপের অন্যতম নেতা। এরা ছিল ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্বিচার গণহত্যাসহ বহু অপরাধযজ্ঞের হোতা। অথচ মানবাধিকারের দাবিদার পাশ্চাত্য ওইসব বর্ণবাদী অপরাধীদের সহায়তা দিয়ে এসেছে।
ইহুদিবাদীরা ফিলিস্তিনি জাতির অস্তিত্বকেই স্বীকার করে না। তারা ফিলিস্তিনিসহ ইহুদিবাদী লক্ষ্যের বিরোধীদের দমনের জন্য যে কোনো অমানবিক পন্থার আশ্রয় নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করে না। আর এটাই ইহুদিবাদের অন্যতম মূলনীতি।
ইহুদিবাদী ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গোল্ডামায়ার ১৯৬৯ সালের ১৫ ই জুন "ডেইলি সানডে টাইমস" পত্রিকায় লিখেছেন, " ফিলিস্তিনি বলতে কিছু নেই। এটা এমন নয় যে ফিলিস্তিনে ফিলিস্তিনি বলে কোনো জাতি ছিল এবং তারা নিজেদের ফিলিস্তিনি জাতি বলে দাবি করত, আর আমরা এসে তাদের বিতাড়িত করেছি ও তাদের দেশ দখল করে নিয়েছি। না, ফিলিস্তিনি জাতি বলতেই কিছু নেই।"
১৯৫৪ সালে ইসরাইলের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী "বেনজায়ন দিনুর" বিশ্ব ইহুদিবাদী সংস্থার উদ্যোগে প্রকাশিত " হগানাহ'র ইতিহাস" শীর্ষক বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন, " ইসরাইল তথা আমাদের দেশে ইহুদি ছাড়া অন্য কারো স্থান নেই। আমরা আরবদের বলব, বেরিয়ে যাও। তারা যদি এতে রাজি না হয় বা প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তাহলে আমরা তাদের বের করে দেব।"
এ ধরনের জাতিগত দম্ভ নিয়েই ইহুদিবাদীরা ১৯২০ ও ১৯৩০ এর দশকে ইসরাইল গঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন ঘাতক স্কোয়াড গঠন করে যাতে ফিলিস্তিনিদের দেশত্যাগে বাধ্য করা যায়।
১৯২০ ও ১৯৩০ এর দশকে ইহুদিবাদীরা গণহত্যা চালিয়ে বহু ফিলিস্তিনিকে শহিদ করেছে। যেমন, ১৯৪৮ সালের ১৫ ই মে ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীরা বায়তুল মোকাদ্দাস বা পবিত্র জেরুজালেম শহরের " কিং ডেভিড" হোটেলে বোমা হামলা চালিয়ে ৯১ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে।
এ ছাড়াও একই শহরের "সামির আমিস" হোটেলে ইহুদিবাদীদের বোমা হামলায় ত্রিশ জন নিহত হয়। ১৯৪৮ সালের নয়ই এপ্রিল, অর্থাৎ ইসরাইলের অস্তিত্ব ঘোষণার প্রায় এক মাস আগে ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীরা " দির ইয়াসিন" নামক এক ফিলিস্তিনি গ্রামে বড় ধরনের গণহত্যা চালিয়েছিল। ওই গণহত্যার নৃশংসতা যে কোনো মুক্তমনা মানুষের হৃদয়কে দলিত মথিত করে। সাবেক ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী মোনাচেম বেগিনের নেতৃত্বে " ইরগুন" নামের ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যরা " দির ইয়াসিন" গ্রামের নিরস্ত্র জনগণের ওপর হামলা চালিয়ে গ্রামটির শত শত নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে। ওই সন্ত্রাসীরা বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনির লাশ গ্রামটির কূয়ায় নিক্ষেপ করে এবং কিছু লাশ কূয়ার পাশে জড় করে রাখে যাতে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আরো বেশি ত্রাসের সঞ্চার হয় ও তারা ফিলিস্তিন ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায়।
" ইরগুনের ঐতিহাসিক উত্থান " শীর্ষক বইয়ে মোনাচেম বেগিন লিখেছেন, " দির ইয়াসিন গ্রামে বিজয় অর্জন ছাড়া ইসরাইল সরকার অস্তিত্বের মুখ দেখতে পারত না। "
বিশ্বের রাজনৈতিক ও সংবাদ মহলে ওই হত্যাযজ্ঞ ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এমনকি অনেক ইহুদি চিন্তাবিদও ওই অপরাধযজ্ঞের তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন। বিশ্বখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় এক চিঠি পাঠিয়ে দির ইয়াসিন গ্রামে ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীদের গণহত্যার নিন্দা জানিয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালের ২৮ শে ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মোনাচেম বেগিনের সফরের সময় ওই চিঠি প্রকাশিত হয়। ওই চিঠিতে স্বাক্ষরকারী ব্যক্তিত্বরা " ইসরাইল " নামক অস্তিত্বের আবির্ভাবের ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
ওই চিঠির প্রথমদিকে লেখা হয়েছে, " সাম্প্রতিক শতকের সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাগুলোর মধ্যে ইসরাইল গঠন অন্যতম এবং এর চেয়েও খারাপ বিষয় হল " ফ্রিডম পার্টি বা স্বাধীনতা দল গঠন। এই দলের আদর্শ ও দর্শন নাৎসি এবং ফ্যাসিবাদের অনুরূপ। ... যে (মার্কিন সরকারের) কর্মকর্তারা সারা বিশ্বে ফ্যাসিবাদের বিরোধী বলে দাবি করেন তারা বেগিনের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও অতীত সম্পর্কে জানার পরও ওই দলের সমর্থকদের তালিকায় নাম লেখাতে পারেন তা বোধগম্য নয়।" ওই চিঠির পরবর্তী পর্যায়ে " আরব গ্রামে হামলা" শীর্ষক অংশে দির ইয়াসিন গ্রামে ফিলিস্তিনিদের ওপর মোনাচেম বেগিনের নেতৃত্বাধীন ফ্রিডম পার্টির নৃশংস অপরাধের কথা তুলে ধরে লেখা হয়েছে, " শহর থেকে অনেক দূরে মজলুম বা বঞ্চিত ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এক পাড়াগাঁয়ে ইসরাইলিদের হামলা থেকে ইহুদিবাদীদের ভবিষ্যৎ আচরণ সম্পর্কেও আঁচ করা যাচ্ছে। দির ইয়াসিনের ঘটনা ইসরাইলিদের চরিত্র এবং বিশেষ করে বেগিনের দলের প্রকৃতি স্পষ্ট করেছে।"
চার.
জাতিতে ইহুদি হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বখ্যাত মার্কিন পদার্থ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ফিলিস্তিনের দির ইয়াসিন গ্রামে ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীদের হামলার নিন্দা জানিয়ে ১৯৪৮ সালে মার্কিন দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমসে যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন তাতে তিনি ইহুদিবাদের সন্ত্রাসী চরিত্র ও বর্ণবাদি প্রকৃতির কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, " যায়োনিজম বা ইহুদিবাদ উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় রহস্যবাদ ও জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের বা অহমিকার সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে। বর্ণবাদী এই আন্দোলনের সমর্থকরা অন্যান্য ফ্যাসিস্ট বা ফ্যাসিবাদী আন্দোলনগুলোর মতই তাদের বিশেষ চিন্তাধারাগুলোকে ধর্মঘট বা প্রতিবাদ সমাবেশ দমন ও স্বাধীন ইউনিয়নগুলো দমনের কাজে ব্যবহার করছে। ইহুদিবাদীরা নিজেদের নীতিমালাতেই ইতালীর ফ্যাসিবাদীদেরকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে ইহুদিবাদের সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। "
শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের এ ধরনের চিঠি বেগিন বা অন্য কোনো ইসরাইলি নেতার সন্ত্রাসী নীতি অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে ন্যুনতম বাধাও সৃষ্টি করতে পারেনি। ইহুদিবাদী দখলদাররা মার্কিন সরকারের সর্বাত্মক মদদ নিয়ে অধিকৃত ফিলিস্তিনে অপরাধযজ্ঞ আরো ব্যাপক মাত্রায় অব্যাহত রাখে।
১৯৪৮ সালে দির ইয়াসিন গ্রামে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদিবাদীদের গণহত্যা ও তাদের ঘরবাড়ী ধ্বংস করাসহ অন্য অনেক অপরাধের ফলে দশ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি শরণার্থীতে পরিণত হয় এবং তারা আশপাশের আরব দেশগুলোতে আশ্রয় নেয়। ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক হারে শরণার্থী হতে বাধ্য করার এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকায় জাতিসংঘ ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের দেখাশুনা করার জন্য একজন বিশেষ মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়। কাউন্ট ফক বার্নাডোট নামের ওই মধ্যস্থতাকারী ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ফিরে আসার সুযোগ দেয়ার জন্য ইসরাইলের সাথে অনেক দেন-দরবার করেন। কিন্তু ইহুদিবাদী দখলদাররা তার তৎপরতায় বাধা সৃষ্টি করে। বার্নাডোট এ প্রসঙ্গে তার সর্বশেষ প্রতিবেদনে লিখেছেন, " নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদের স্বদেশে ফিরে আসতে বাধা দেয়া মৌলিক মানবিক নীতিমালার লংঘন। এমন সময় ফিলিস্তিনিদের স্বদেশে ফিরে আসতে বাধা দেয়া হচ্ছে যখন ব্যাপক হারে বহিরাগত ইহুদিদের ফিলিস্তিনে অভিবাসী করা হচ্ছে। অথচ ফিলিস্তিনিরা শত শত বছর ধরে এই দেশটির অধিবাসী। "
সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ইহুদিবাদীদের জবর দখল ও ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ফলে সৃষ্ট বিপর্যয় কেবল দু-একটি দিকেই সিমীত ছিল না। বরং এ বিপর্যয় ছিল বহুমুখি ও ব্যাপক বিস্তৃত। বল প্রয়োগের মাধ্যমে ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর ইহুদিবাদী দখলদাররা কয়েক মিলিয়ন ফিলিস্তিনির সহায়-সম্পদ দখল করে। বিশ্বের ইতিহাসে কোনো এক জাতির স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ দখল করে নেয়ার এটাই সবচেয়ে বড় ঘটনা।
এ প্রসঙ্গে ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ মধ্যস্থতাকারী বার্নাডোট লিখেছেন, " ইহুদিদের হামলার মুখে বেশির ভাগ শরণার্থী তাদের সমস্ত সহায়-সম্বল ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এমনকি তারা মূল্যবান জিনিষগুলোও সাথে নেয়ার সময় পাননি। কেবল গায়ে থাকা পোশাক পরা অবস্থায় তাদেরকে স্বদেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। "
ইহুদিবাদীদের লুটপাট সংক্রান্ত জাতিসংঘের প্রতিবেদন ১৯৪৮ সালের ১৬ ই সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে পেশ করা হয়। এই প্রতিবেদন প্রকাশের দায়ে ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীরা পরের দিনই বায়তুল মোকাদ্দাস বা জেরুজালেমের তৎকালীন অধিকৃত অংশে কাউন্ট বার্নাডোট ও তার ফরাসি সহকারী "কর্নেল সেরুত"-কে হত্যা করে। এই সন্ত্রাসী হত্যা পরিকল্পনা করেছিল সাবেক ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ইসহাক শামিরের নেতৃত্বাধীন " ওয়েস্টার্ন" নামক সন্ত্রাসী দল।
ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি গণহত্যা ও তাদের শরণার্থীতে পরিণত করার ইহুদিবাদী অপরাধযজ্ঞ সম্পর্কে বার্নাডোটের রিপোর্ট এবং তার শান্তি পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দখলদার ইসরাইলের জন্য মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর এ কারণেই ইহুদিবাদীরা তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। ইসহাক শামিরের নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসী দল " ওয়েস্টার্ন " জাতিসংঘের বিশেষ মধ্যস্থতাকারী বার্নাডোট হত্যার দায়িত্ব স্বীকার করে। *****ইসরাইল রাষ্ট্র জন্মের ইতিহাস*****
ইহুদিবাদীরা ইসরাইল সৃষ্টির আগ থেকেই সন্ত্রাস ও জবর দখলের মাধ্যমে তিন দশক ধরে ফিলিস্তিনে ভয়াবহ ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। মার্কিন সরকারসহ পশ্চিমা সরকারগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা পেত বলে তারা তাদের বর্ণবাদী লক্ষ্যগুলো পূরণের জন্য যে কোনো ধরনের সন্ত্রাস ও অপরাধে জড়িত হতে দ্বিধা বোধ করত না। এমনকি ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী দলগুলো বর্ণবাদী লক্ষ্য হাসিলের জন্য ইংরেজ ও ইহুদিদের হত্যা করতেও কুণ্ঠিত হয়নি। তবে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে ইহুদিবাদীরা সবার আগে ফিলিস্তিনি ও আরবদের জন্যই ওই অঞ্চলকে নিরাপত্তাহীন করতে চেয়েছে।
ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীরা ফিলিস্তিনি মুসলমানদের সমাবেশ স্থল ও বাসগুলোতে বোমা হামলা চালাত। যেমন, ইহুদিবাদীরা ১৯৩৮ সালের ২৫ শে জুলাই আরবদের সবজি বাজারে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ৩৯ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা ও ৬৪ জনকে আহত করেছিল। ওই হামলার এক মাস পর একই স্থানে ইহুদিবাদীদের অনুরূপ এক হামলায় ২৩ জন ফিলিস্তিনিকে শহীদ ও ত্রিশ জনকে আহত করে।
ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীরা ত্রিশ থেকে চল্লিশের দশকে ফিলিস্তিনিদের ট্রেন বা রেলগাড়িসহ নানা গণ-পরিবহণে বহু বার হামলা চালিয়েছে। কখনও গুলি বর্ষণ করে ও কখনও বোমা বসিয়ে ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীরা নৃশংস হামলা চালাত। ওইসব অমানবিক হামলায় যেসব নিরীহ ফিলিস্তিনি শহীদ হত তাদের বেশিরভাগই ছিল নারী ও শিশু। ফিলিস্তিনিদের ট্রেন বা রেলগাড়িতে ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীদের হামলা সর্বোচ্চ মাত্রায় উপনীত হয়েছিল ইসরাইলি সরকার গঠনের বছরটিতে। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে ফিলিস্তিনিদের বেশ কয়েকটি রেলগাড়িতে সন্ত্রাসী ইহুদিবাদীদের পেতে রাখা বোমার বিস্ফোরণে ৯০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি শহীদ এবং ১৫০ জন আহত হয়েছিল। ওই বছর সন্ত্রাসী ইহুদিবাদীরা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ফিলিস্তিনিকে হত্যার চেষ্টা চালায় এবং ত্রাসের ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে মাতৃভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করে।
পাঁচ.
ইহুদিবাদীরা ১৯৪৮ সালের ৫ ই সেপ্টেম্বর বায়তুল মোকাদ্দাস বা জেরুজালেমের "সামিরআমিস" হোটেলে বোমা হামলা চালিয়ে স্পেনের কনসুলারসহ ২০ ব্যক্তিকে হত্যা করে। ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী গ্রুপ "হগানা" ওই হত্যাকান্ডের দায়িত্ব স্বীকার করে। এর আগে ১৯৪৮ সালের এপ্রিল মাসে "টেল লিটফানস্কি" নামক সাবেক বৃটিশ সেনা শিবিরকে বাসস্থান হিসেবে ব্যবহারকারী ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদিবাদীদের নৃশংস হামলায় ৯০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়। ওই বছর ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোও ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীদের ব্যাপক হামলার শিকার হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের ১৩ মার্চ "কাফার হোসাইনিয়াহ" গ্রামে এমনই এক হামলায় ইহুদিবাদীরা ৬০ জন ফিলিস্তিনিকে শহীদ করেছিল। সে বছরই এপ্রিল মাসে ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীরা দিন ইয়াসিন গ্রামে নৃশংস গণহত্যা চালিয়েছিল।
১৯৪৮ সালের জুলাই মাসের ১১ ও ১২ তারিখে ইহুদিবাদী নরঘাতকরা ফিলিস্তিনের "লাদ" শহরে ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। ইহুদিবাদীরা নির্বিচার গুলি বর্ষণ করে হত্যা করেছিল ওই শহরের নিরপরাধ ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের। ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীরা লাদ শহরে ফিলিস্তিনিদের ঘরে ঘরে অভিযান চালিয়ে ওই হত্যাযজ্ঞ চালায়। ওই গণহত্যা অভিযানে ২৫০ জন ফিলিস্তিনি শহীদ এবং বহু সংখ্যক আহত হয়েছিল। এ গণহত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছিল মোশে দায়ান। দায়ান পরবর্তীকালে ইসরাইলি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হয়েছিল।
ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীরা ১৯৪৮ সালের ২২ শে এপ্রিল ফিলিস্তিনের " হাইফা " শহরে হামলা চালিয়ে ৫০০ ফিলিস্তিনিকে শহীদ করে। ওই বন্দর নগরী থেকে বেসামরিক নারী ও শিশুসহ অন্য ফিলিস্তিনিরা সমুদ্র পথে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় আরো একবার ইহুদিবাদী নরঘাতকদের হামলার শিকার হয়। ওই দ্বিতীয় হামলায় আরো ১০০ ফিলিস্তিনি শহীদ ও ২০০ জন আহত হয়েছিল।
ফিলিস্তিনকে সেখানকার মুসলমানদের জন্য অনিরাপদ করা এবং তাদেরকে দেশত্যাগে বাধ্য করার জন্যই ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীরা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালাত। এইসব হামলা ছাড়াও ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীরা কখনও কখনও বৃটিশ ও এমনকি ইহুদিদের ওপরও হামলা চালাত। বিশেষ সুবিধা বা ছাড় আদায়ের লক্ষ্যে ইহুদি ও বৃটিশদের ওপর ওইসব হামলা চালাত ইহুদিবাদীরা। যেমন, ১৯৩৯ সালে বৃটিশ সরকার ঘোষণা করে যে যেসব ইহুদি অভিভাসী বৃটিশ কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে ফিলিস্তিনে প্রবেশ করবে তাদেরকে ফিলিস্তিনে থাকার অনুমতি দেয়া হবে না। ওই নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য ১৯৪০ সালের ২৫ শে নভেম্বর বৃটিশ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ফিলিস্তিনে প্রবেশকারী কয়েক শত ইহুদিকে " প্যাট্রিয়া " নামক জাহাজে চড়িয়ে বৃটেনের কোনো একটি উপনিবেশের দিকে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। এইসব ইহুদিদের অবৈধভাবে ফিলিস্তিনে আনত "ইহুদি এজেন্সি"। ফলে বৃটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করার জন্য এজেন্সি সন্ত্রাসীদের সহায়তায় ওই জাহাজে বোমা পেতে রাখে। ১৯০০ অভিবাসী ইহুদি নিয়ে "প্যাট্রিয়া" যখন হাইফা বন্দর ত্যাগ করছিল তখন ওই বোমার বিস্ফোরণে ১৪০ জন ইহুদি প্রাণ হারায়।
১৯৪২ সালে অনুরূপ এক ঘটনায় ৭৬৯ জন অবৈধ ইহুদি অভিবাসী প্রাণ হারায়। বৃটিশ সরকারের বিনা অনুমতিতে ফিলিস্তিনে প্রবেশের জন্য ওইসব ইহুদিকে স্ট্রমা নামক একটি জাহাজে ওঠানো হয়েছিল। ৭৬৯ জন ইহুদি আরোহী নিয়ে ওই জাহাজ ইস্তাম্বুল থেকে ফিলিস্তিনের দিকে রওনা দেবে বলে কথা ছিল। কিন্তু বৃটিশ সরকার জাহাজটিকে ফিলিস্তিনে যাবার অনুমতি না দেয়ায় হগানার পেতে রাখা বোমার বিস্ফোরণে জাহাজটি কৃষ্ণ সাগরে ডুবে যায় এবং ওই জাহাজের সকল আরোহী মারা যায়। ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসীদের আগমনের ওপর সীমাবদ্ধতা তুলে নেয়ার জন্য বৃটিশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে ইহুদি এজেন্সি এটা প্রচার করে যে ওই ইহুদিরা অবৈধ অভিবাসন বিরোধী বৃটিশ আইনের প্রতিবাদে আত্মহত্যা করেছিল। ইহুদিবাদীদের এই মিথ্যা প্রচার-প্রপাগান্ডার চাপের মুখে বৃটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদিদের অবৈধ অভিবাসন বা অবাধ প্রবেশকে মেনে নেয়। ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনিদের সব বা বেশিরভাগ ভূখন্ড গ্রাস করাই ছিল ইহুদিবাদীদের ওইসব অপকৌশলের লক্ষ্য। অবশেষে ১৯৪৮ সালে বৃটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো জাতিসংঘে ইসরাইল নামক (অবৈধ) রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব পাশ করলে ইহুদিবাদীদের ওই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়।
অবশ্য অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পরও ইহুদিবাদীরা কখনও সন্ত্রাসী এবং আধিপত্যকামী তৎপরতা বন্ধ করেনি। "বিধাতার নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ জাতি" হওয়ার দাবিদার বর্ণবাদি ইহুদিবাদীরা মিশরের নীল নদ থেকে ইরাকের ফোরাত নদী পর্যন্ত বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর ছিল। তাই ইহুদিবাদীদের আগ্রাসন ও ভূমি দখলের নীতি কেবল ফিলিস্তিনেই সিমীত ছিল না। ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো ওই স্বপ্নের আলোকে ফিলিস্তিনের ব্যাপক বিস্তৃত ভূখন্ড দখলের পর অন্য আরব ও মুসলিম দেশগুলোর ভূখণ্ড দখলের কাজ শুরু করে। এই কাজের জন্য ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো ইসরাইল গঠনের পর ইসরাইলি সশস্ত্র বাহিনী ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা " মোসাদ"-এর মধ্যে একীভূত হয়।
ইসরাইল গঠনের পর বিশ্ববাসী ইসরাইলের নতুন সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করে যা আসলে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসেরই উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত। কারণ, এইসব সন্ত্রাসী তৎপরতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে পরিচালিত না হয়ে একটি অবৈধ রাষ্ট্রের মাধ্যমে পরিকল্পিত ও বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়ে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ও এমনকি ফিলিস্তিনি নয় এমন অনেক ব্যক্তিও বিভিন্ন দেশে প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু এইসব সন্ত্রাসী তৎপরতার জবাবে পশ্চিমা সরকারগুলো কখনও ইসরাইলের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ বা নিন্দা জানানোর চেষ্টাও করেনি। অন্যদিকে পশ্চিমা সরকারগুলো ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইরত এবং নিজ অধিকার আদায়ে সচেষ্ট ফিলিস্তিনিদের সব সময়ই সন্ত্রাসী বলে অপবাদ দিয়ে এসেছে।
ছয়.
ইহুদিবাদীদের আগ্রাসন ও ভূমি দখলের নীতি কেবল ফিলিস্তিনেই সীমিত ছিল না। ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো ওই স্বপ্নের আলোকে ফিলিস্তিনের ব্যাপক বিস্তৃত ভূখণ্ড দখলের পর অন্য আরব ও মুসলিম দেশগুলোর ভূখন্ড দখলের কাজ শুরু করে। ইসরাইল গঠনের পর বিশ্ববাসী ইসরাইলের নতুন সন্ত্রাসী কার্যক্রম বা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস প্রত্যক্ষ করে ওই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়ে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ও এমনকি ফিলিস্তিনি নয় এমন অনেক ব্যক্তিও বিভিন্ন দেশে প্রাণ হারিয়েছেন।
ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী দল বা গ্রুপগুলো ফিলিস্তিনে দখলদার ইসরাইল সরকার গঠনের পর ইসরাইলি সেনাবাহিনী ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের নাম ধারণ করে সন্ত্রাসী তৎপরতা অব্যাহত রাখে। ইসরাইল সৃষ্টির পর নবগঠিত ইসরাইলি সশস্ত্র বাহিনীর সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে " ইউনিট-১০১" ছিল অন্যতম। এই ইউনিটের প্রথম কমান্ডার ছিলেন "এ্যারিয়েল শ্যারন"। ফিলিস্তিনের আশপাশের আরব দেশগুলোর হুমকি মোকাবেলার নামে এই ইউনিট অনেক অপরাধযজ্ঞ চালিয়েছে। ১৯৫২ সালের ১১ ই জানুয়ারি বায়তুল মোকাদ্দাসের কাছাকাছি জর্দানর বাইত জাল গ্রামে ওইসব অপরাধের মধ্যে অন্যতম। ওই হামলায় সাতজন আরব নিহত হন যাদের মধ্যে ছিল চার শিশু, দুজন মহিলা এবং একজন পুরুষ। ওই একই মাসের শেষের দিকে ইসরাইলের সন্ত্রাসী গ্রুপ " ইউনিট-১০১" " ফালামেহ" ও "রানতিস" গ্রামে হামলা চালায়। অনেক নিরপরাধ আরব ওইসব হামলায় নিহত হয় যাদের বেশিরভাগই ছিল নারী ও শিশু। "
ইউনিট-১০১" ১৯৫৩ সালের ১৪ ই অক্টোবর জর্দানের "ক্বিবিয়া" গ্রামে হামলা চালায়। ওই হামলায় ৪১ টি বাসভবন ও একটি স্কুল ধ্বংস হয় এবং মারা যায় ৪২ জন আরব। ওই হামলার দুই ঘন্টা পর জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকরা গ্রামটি পরিদর্শন করে। পরিদর্শকরা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে জমা দেয়া তাদের রিপোর্টে লিখেছেন, " গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া লাশ এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ীগুলোর দরজা ও জানালায় প্রচুর গুলির চিহ্ন থেকে বোঝা যায় যে ওইসব বাড়ীর অধিবাসীদেরকে ঘরের ভেতরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে এবং ওই অবস্থায়ই বাড়ী-ঘরগুলো ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। ইসরাইলি সেনারা ওই গ্রামে পৌঁছার পর ঘর-বাড়ীগুলোর ওপর স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটিক আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি বর্ষণ করেছে এবং একই সময়ে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে ওই বাড়ী-ঘরগুলোকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়।"
ইসরাইলের সন্ত্রাসী গ্রুপ " ইউনিট-১০১" এর নানা সন্ত্রাসী তৎপরতা এ্যারিয়েল শ্যারন এক সাক্ষাৎকারে গর্ব প্রকাশ করে বলেছেন, " অবশ্যই হামলা করা এবং অবিরাম হামলা চালানো জরুরি। অবশ্যই সন্ত্রাসী তথা ফিলিস্তিনিদের সব অঞ্চলেই দমন করতে হবে। ইসরাইলে, কিংবা আরব দেশে অথব অন্য যে কোনো দেশেই ফিলিস্তিনিরা থাকুক না কেন, তাদের কিভাবে হত্যা করতে হবে তা আমি জানি এবং আমি নিজেই তাদের হত্যা করছি। "
ইহুদিবাদী দখলদাররা ফিলিস্তিন দখল করার গোড়া থেকেই মজলুম ফিলিস্তিনিদের সন্ত্রাসী বলে অভিহিত করত এবং নিজেদের মজলুম বা বঞ্চিত-নিপীড়িত হিসেবে তুলে ধরত। সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুদের ওপর গণহত্যা চালানোকে বৈধতা দেয়ার লক্ষ্যেই ইসরাইল এ ধরনের প্রচারণা চালাত। ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালানোর জন্য দখলদার ইসরাইল কখনও দেশ ও স্থানের সীমারেখা মেনে চলেনি। ইসরাইল গঠনের পর থেকেই ফিলিস্তিনি গ্রাম ও এমনকি ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরগুলোও প্রায়ই ইসরাইলি সেনাদের হামলার শিকার হয়েছে।
১৯৫৩ সালের ২৮ শে আগস্ট জাতিসংঘের সাহায্য ও সহযোগীতার ওপর নির্ভরশীল গাযার আলবারিজ শরণার্থী শিবির ইসরাইলি হামলার শিকার হয়। ইহুদিবাদী দখলদাররা ওই শরণার্থী শিবিরের ছোট ছোট ঘরগুলোর জানালা দিয়ে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং গ্রেনেড হামলার হাত থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য সচেষ্ট ফিলিস্তিনিদের ওপর গুলি বর্ষণ করে ইহুদিবাদীরা। ওই হামলায় ২০ জন ফিলিস্তিনি শহীদ ও ৬২ জন আহত হয়। ইহুদিবাদীরা ফিলিস্তিনিদের হত্যার জন্য সব ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করত। এ ক্ষেত্রে তারা কোনো কোনো হামলার পদ্ধতি প্রথমবারের মত আবিস্কার করে। যেমন, পত্র-বোমা। ১৯৫৬ সালের ১৩ ই জুলাই মিশরের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা কর্নেল মোস্তফা হাফেজ গাযায় বিস্ফোরক-ভর্তি একটি চিঠি খুলতে গিয়ে প্রাণ হারান। পরদিন বা একই মাসের ১৪ ই জুলাই মিশরের সেনা-কর্মকর্তা সালাহ মোস্তফা জর্দানের আম্মানে বইয়ের প্যাকেট মনে করে একটি প্যাকেট খুলতে গিয়ে বোমা বিস্ফোরণের শিকার হন এবং মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার কয়েক দিন পর শাহাদত বরণ করেন। সালাহ মোস্তফার শাহাদত ইহুদিবাদীদের জন্য সুখময় হয়নি। কারণ, ওই হামলার পর সুয়েজ খালকে জাতীয়করণ করার ব্যাপারে মিশরের নেতা জামাল আবদুন নাসেরের সংকল্প আরো শক্তিশালী হয়।
১৯৫৬ সালে মিশরের জাতীয়তাবাদী নেতা জামাল আবদুন নাসের সুয়েজ খালকে জাতীয়করণ করার ঘোষণা দেন। তার ওই ঘোষণা আরব বিশ্বের জনগণের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ, উদ্দীপনা ও আনন্দের জোয়ার সৃষ্টি করে। কারণ, সুয়েজ খাল ছিল ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীদের শোষণের স্মারক বা স্মৃতি-চিহ্ন। ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য সুয়েজ খাল অতি গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত জলপথ। ফলে ইউরোপীয় উপনিবেশকামী দেশগুলো, বিশেষ করে ফ্রান্স ও বৃটেন নাসেরের ওই পদক্ষেপে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়।
ইহুদিবাদী ইসরাইলও মিশরে জাতীয়তাবাদী নেতার আবির্ভাবকে ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে ধরে নেয়। এ অবস্থায় ১৯৫৬ সালের ২১ শে অক্টোবর ফ্রান্স, বৃটেন ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক এবং সেনা কর্মকর্তারা প্যারিসে এক বৈঠকে মিলিত হয়ে মিশরে সমন্বিত ও সম্মিলিত হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। আর এ সময় জনমতকে ভিন্ন দিকে ব্যস্ত রাখার জন্য দখলদার ইসরাইল জর্দান সীমান্তে কাফার ক্বাসেম নামক গ্রামে এক গণহত্যা অভিযান চালায়। #
তথ্যসূত্র : http://bangla।irib।ir/index.php/2010-04-21-08-08-01/2011-01-04-09-08-49/28102-2011-05-27-08-49-44.हटमल